html

Showing posts with label MAY2018. Show all posts
Showing posts with label MAY2018. Show all posts

Sunday, May 6, 2018

সম্পাদকীয়





দেহ্‌লিজ, জন্ম নিলো । দেহ্‌লিজ দিল্লির বাংলা সাহিত্যকে যথাযথ মর্যাদায় প্রকাশ করার উদ্দেশ্যে ।  দেহ্‌লিজ কাজ করবে কমিউনিটির মধ্যদিয়ে, টেকনোলজির সাহায্য নিয়ে ।  দিল্লি বাংলা মূল ভূখণ্ডের বহুদূরে আরাবল্লী রিজের উপর ঘনয়মাণ সাহিত্যের এই পুষ্প প্রকাশ পাবে ডিজিটাল মাধ্যমে । দিল্লির বাংলা সাহিত্য যার শিকড় পাথুরে জমির অতল গভীরে ঢুকে আছে আর ইতিহাসের পাতায় পাতায় যা নিহিত রয়েছে । সেই শিকড় বেয়ে উপরে উঠে আসা সেই আকরিক যা বাংলা সাহিত্যের কবি, লেখক, নাট্যকারদের লেখনীতে ধরা পড়ছে । বাংলা থেকে দূর কোন এক্সকিউজ নয়, সাহিত্যমানের প্রতি দায়বদ্ধ আমাদের এই দিল্লির সাহিত্য প্রয়াস ।  দেহ্‌লিজের কর্মকাণ্ডে তাই কোলাবোরেশনের বড় একটা শ্রেয় থাকছে । বাংলা সাহিত্য এর কোর । ধনী, গরীব, পুরুষ , মহিলা, কেরানী, আই এস অফিসার , ডাক্তার, রোগী, ছোট, বড় ভেদ ভাও থেকে দূরে এই দেহ্‌লিজের অবস্থান । এর কোন চাঁদা নেই, কোন মেম্বারশীপ নেই । কমিউনিটি ডেভেলপমেন্টের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দেহ্‌লিজ । সোশ্যাল মিডিয়া এই ডেভেলপমেন্টকে ছড়িয়ে দিচ্ছে দিল্লির কোনায় কোনায় ।  


প্রশ্ন থাকতে পারে, সাহিত্যে দিল্লির কোন অবদান আছে নাকি ? কিংবা দিল্লির বাংলা সাহিত্য ? নেই । সাহিত্যের কোন আবার দেশ হয় নাকি ? কিংবা কোন ভৌগলিক বিভাজন ? আমিও মনে করি নেই । যেভাবে জাপানেরও কোন নিজস্ব সাহিত্য নেই, কোরিয়ার সাহিত্যও আলাদা নয় । ব্রাজিলেরও কোন পৃথক সাহিত্য নেই, স্পেনেরও কোন নিজস্ব সাহিত্য নেই । সাহিত্যে কোন ভৌগলিক বৈশিষ্ট্য থাকে নাকি ? রুশ ভাষার সাহিত্যে এমন কি আছে ? কিংবা ইজরায়েলের তো কোন সাহিত্য থাকতে পারে না । কারণ সাহিত্যের কোন ভৌগলিক সীমারেখা নেই । অন্ততঃ তাই মেনে নিয়েছি প্রথমে । আর যদি তাই যদি হতো ! টিউনড থাকুন । পরবর্তী সংখ্যাগুলিতে নজর রাখুন ।

মাফ করবেন, মাঝখানে বলে ওঠায় । লক্ষ্য করুন , এই প্রথম প্রকাশে কোন সম্পাদকের নাম নেই । দিল্লিতে একটা সাহিত্য আড্ডা গড়ে উঠেছে, অন-লাইন, অফ-লাইন মিলেমিশে । আমি 'অ্যাডমিন' হিসাবে একটা রূপ দেওয়ার কথা বলছি । সোসাল মিডিয়াতে একটা গ্রুপ তৈরী করেছি, দিল্লিতে বসবাসকারী টেম্পোরারী ও পার্মানেন্ট, চাকরীর সূত্রে বাস করতে আসা সরকারী ও বেসরকারী, দিল্লির বুকে দ্বিতীয় বা তৃতীয়  প্রজন্মের বাঙালিদের নিয়ে । আমাদের পত্রিকাটির এইভাবে জন্ম যে আমরা প্রতিদিন যে সাহিত্য যাপনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, তা ডিজিটালে ধরা থাক । আরো ছড়িয়ে পড়ুক আমাদের সাহিত্য ভাবনা, দিল্লিবালা হিসাবে আমরাও কিছু যুক্ত করতে চাই । 

এইবার জেনে নেওয়া যাক, দিল্লিতে সাহিত্য চর্চা বলতে কি কি বুঝি ? দিল্লিতে কি কোনো পত্রিকা নেই ? এতদিন দিল্লিতে কোন সাহিত্য আড্ডা কি ছিলো না ? আমরা কিএটা আবিষ্কার করলাম, নাকি আগেও ছিলো ? 

দিল্লির সাহিত্যের ইতিহাস  অনেক দিনের । বাংলা চর্চার ইতিহাসও আমার জন্মের আগের । চিত্তরঞ্জন পাকড়াশীর "দিল্লির বাঙ্গালি" বইটিকে যদি রিফারেন্স ধরি, ১৮৩৭ সালের প্রথম বাঙ্গালি হিসাবে উমাচরণ বসুর নাম উল্লেখ করতে হয় , আর ছাপাখানার উল্লেখ করতে গেলে তারিখ আসে ১৮৮৩ সালে আই এম এইচ প্রেস প্রতিষ্ঠানের । সাহিত্য আড্ডার সন তারিখ হিসাবে ১৯৩০ সালের কথা আসে যখন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এসেছেন দিল্লিতে । চন্ডালিকা, শ্যামা ইত্যাদি নিয়ে রিগ্যাল সিনেমা হলে নানান নৃত্যানুষ্ঠান করেছেন যেখানে অনুষ্ঠান দেখতে এসেছিলেন মহাত্মাগান্ধী নিজে । নাটকের কথা হলে, ১৯৩৩ সালে নিউ দিল্লি বেঙ্গলি ক্লাব বাংলা নাটক মঞ্চস্থ করে । ছবি আঁকার মোটামুটি একটা তারিখ পাওয়া যাচ্ছে ১৯১৮ । সারদা উকিল আর দিল্লির রাইস আদমি সুলতান সিং মিলে রুক্ষ-শুষ্ক-অতীত ঐশ্বর্যের ভগ্নস্তুপে ভরা দিল্লিতে চিত্রকলাপিঠে পরিণত করেন । লিখিত সাহিত্য আড্ডার যেরকম তারিখ পাওয়া যাচ্ছে তা স্বাধীনতা পরবর্তী যুগে । চানক্য সেনের 'ইন্দ্রপ্রস্থ' সাহিত্য পত্রিকা কে দিয়ে শুরু করলে তা মোটামুটি ১৯৬০ সালের দিকে পড়ে। 

এই এতকথার অবতারণা করা উদ্দেশ্য হলো, এই আমাদের সাহিত্য প্রচেষ্টা দিল্লির বুকে নয়া কিছু না । বরং বলা যায় অপরিষ্কার ধারণা আমাদের মধ্যেই রয়েছে কারণ এই প্রচেষ্টার যথাযথ ডকুমেন্টেশন হয় নি আর সেযুগে গুগল বলেও কিছু ছিলো না । কলকাতাপ্রেমী বাংলা সাহিত্য অন্য এলাকার ভাষা বা সাহিত্যকে তেমন গুরুত্ব কখনোই দেয়নি । বাংলা মিডিয়া বলতে যা বোঝায় তা কলকাতা বা ঢাকার, তারা এই এতদূর দিল্লির শহরের সাহিত্য নিয়ে কেনই বা মাথা ঘামাবেন ? এই ২০১৮ তে দাঁড়িয়ে এখনো যদি আমরা ডকুমেন্টেশন ও সাহিত্য প্রচেষ্টা ডিজিটাইজড না করি আমাদের এই সাহিত্য প্রয়াস  ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বলে অকালেই কালের অন্ধকার পাতালগৃহে ধুলো গড়াগড়ি খাবে । 

কারা দিল্লির লেখক ?  দিল্লিতে ঠিক কতজন বাঙালি লেখক আছেন ? কতগুলি পত্রিকা ? আমার কাছে সঠিক তথ্য নেই । অনুমাণ আছে । আনুমানিক ২০টি বাংলা পত্রিকা নিয়মিত বেরিয়ে থাকে ।  এ ছাড়াও বিভিন্ন ক্লাব, সমাজ, কালীবাড়ী, এশোসিয়েশন দূর্গাপূজার ব্রোসিওর বের করে থাকেন । তাতেও অনেক লেখকের আনাগোনা থাকে ।  এছাড়াও দিল্লিতে রয়েছে নাট্যগোষ্ঠী যারা নিজেদের নাটক নিজেরাই লিখে চলেছেন । আমার আন্দাজ মতো দেড়শত সিরিয়াস কবি/ গল্পকার/নাট্যকার দিল্লিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছেন আর অন্যান্য শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে থাকার সুবাদে অভিনেতা, চিত্রকর, সঙ্গীতকার, বাচিক শিল্পী, গৃহবধুরাও কবিতা লিখছেন ।  এই সমস্ত লেখার কি গুণাগুণ, কালের বিচারে তারা কোথায় অবস্থান করবে সেই সিদ্ধান্ত আমার কাছে নেই, আমি মোটামুটি নিজের দায়িত্বজ্ঞানে বুঝলাম , এই সাহিত্য প্রয়াস কোথাও লিপিবব্ধ থাক । 

এইবার দেহ্‌লিজের কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে কিছু  আলোচনা করা যাক । বর্তমান দিল্লির বিভিন্ন-কোণে চলছে সাহিত্য প্রয়াস । বিভিন্ন পত্রিকাকে কেন্দ্র করে গ্রুপ ও লিখিত সাহিত্যের বিকাশ ঘটছে । পত্রিকাগুলি পৌঁছে যাচ্ছে কলকাতা, শিলিগুড়ি, মুম্বাই, পুনে, ব্যাঙ্গালোর ।   দিল্লির বিভিন্ন সাহিত্য আড্ডা ও সঙ্গীত এর উচ্চতা সম্পর্কে আর ২২ লক্ষ বাঙ্গালির সন্দেহ নেই । সি আর পার্ক, নয়ডা, দ্বারকা,  বসন্তকুঞ্জ, মুক্তধারায় সারাবছর চলছে বাংলা অনুষ্ঠান । বাংলাদেশ হাই কমিশনে ঢাকার বাঙালি শিল্পীদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বাংলা অনুষ্ঠান পরিবেশন করছেন দিল্লির সাহিত্য-গ্রুপ । এই সমস্ত সাহিত্য প্রয়াস এত ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, আর সহস্র সাল পুরানো দিল্লি শহরের এত ব্যাপ্তি যে এতটা এলাকার কবি, শিল্পী, নাট্যকারদের প্রচেষ্টাকে একসাথে করাটা একটা চ্যালেঞ্জ । ছোট ছোট গ্রুপে কাজ করে দিল্লির সাহিত্য গোষ্ঠী গুলো । শ্রেণী বিভেদ, গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব, ইগোক্লাস, অর্থনীতি, অন্যান্য ভাষার প্রাধান্য মূল সমস্যা । বাংলা ছাত্র কমে যাচ্ছে স্কুল থেকে, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উঠে যাচ্ছে বাংলা বিভাগ । এমত অবস্থায় নিয়মিত সাহিত্য আসর চালিয়ে যাওয়া, লাইক-মাইন্ডের লোকদের সাহিত্য আলোচনা প্রায় বন্ধ হয়ে আসছে । এই সমস্যার সঙ্গে সঙ্গে দূরত্ব আর যানজট সমস্যায় জর্জরিত দিল্লি দারুণ ইঁদুর দৌড়ের যাপনে সাহিত্য প্রয়াস বিচ্ছিন্ন প্রায় । দিল্লি-কেন্দ্রিক কোন সঠিক মিডিয়া বা নিয়মিত সংবাদপত্র না থাকায় দিল্লির সাহিত্যের লাইফ-লাইন ধরা একেবারেই  অসম্ভব হয়ে পড়েছে । দিল্লির সাহিত্য সম্পর্কে জানার মত আজ গুগলেও কিছু গড়ে ওঠেনি । দিল্লি এন সি আর এলাকার কবি, গল্পকারদের মিলন মেলার জন্য একটা ভার্চুয়াল আড্ডার দরকার ছিলো যা এখন 'দিল্লির বাংলা সাহিত্য' গ্রুপের মাধ্যমে বাস্তবায়িত। এই সঙ্গে জুড়ে আছেন লেখক ও পাঠক দুই গোষ্ঠীই । তাদের কমিউনিকেশনের জন্য আজ বোধহয় টেকনোলোজি বড় হাতিয়ার কিছু নেই । ইন্টারনেট আমাদের এই প্রয়াসকে অনেক সহজ করে দিয়েছে । দেহ্‌লিজ ইন্টারনেট পাঠক ও লেখকদের জন্য পত্রিকা ।

দেহ্‌লিজ একটি ওয়েব ম্যাগাজিন । এর প্রিন্ট সংখ্যা যে কোনদিন বের হবে না তা নয়, কিন্তু সেই ফান্ড আমাদের নাই । দেহ্‌লিজ পরিচালিত হয় একটি গ্রুপের দ্বারা । গ্রুপটার নাম 'দিল্লির বাংলা সাহিত্য' । হোয়াটস অ্যাপে চলে । কেউ যুক্ত হতে চাইলে মেল করতে পারেন ঃ poet.area@gmail.com.

আপাতত এই আমাদের সিদ্ধান্ত, দিল্লিতে বসবাসকারী লেখকেরাই এই পত্রিকাতে লিখবে । ৬ মাসের উপর বসবাস করলেই, আমি ধরে নিচ্ছি যে তিনি দিল্লির এন সি আর এর লেখক । যে সমস্ত বাঙালি হিন্দিতে লেখেন, তারাও আমন্ত্রিত । লেখা পাঠানোর ঠিকানা: poet.area@gmail.com.

লেখা পাঠাবেন, ইউনিকোডে । অন্যকোন ফরম্যাটে লেখা নিতে পারছি না । লাইন-ব্রেক দেখানোর জন্য PDF ফরম্যাটে আলাদা ভাবে পাঠাবেন । লেখা বের হইয়ে যাবার পরে লেখাগুলি যেকোনো সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করা যাবে ।  এই সংখ্যায় আমি কেবল টেক্সট লেখা নিলাম । পরবর্তীতে অডিও এবং ভিডিও লেখা আমরা নেবো । এই সংখ্যায় কোন সম্পাদকও নাই । পরবর্তীতে সম্পাদকমন্ডলী রাখা হবে , আপনাদের সমস্ত সহযোগিতা পাবো বলে আমার বিশ্বাস ।



Saturday, May 5, 2018

ফ্রিকোয়েন্টলি আস্কড কোয়েশ্চন

৬ই মে প্রকাশ পাচ্ছে 'দেহ্‌লিজ' 

পীযূষকান্তি বিশ্বাস


আজকের ঘোষণা: দিল্লির বাংলা সাহিত্য গ্রুপের নিজস্ব সাহিত্য পত্রিকা হবে । ওয়েব ম্যাগাজিন ।
সম্ভাব্য প্রতিনিয়ত জিজ্ঞাসা করার প্রশ্নগুলি (FAQ) আমি এই রকম ভাবলাম । আর যেহেতু আমি মনে করি এই গ্রুপের সবাই ক্রিয়েটিভ ব্যক্তি, কবি, গল্পকার, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার , তাদের মতামত নিয়ে এই ওয়েব ম্যাগাজিনের পথনির্দেশ তৈরি করা হবে ।

প্রশ্ন: পত্রিকাটির নাম কি হবে ?
উত্তর: দেহ্‌লিজ

প্রশ্ন: দিল্লি থেকে এত পত্রিকা থাকা স্বত্বেও আর একটি পত্রিকা কেন ?
উত্তর: দিল্লি বাংলা সাহিত্যের কোন ওয়েব প্রেজেন্স নেই । কাল যে কোন ব্যক্তি দিল্লি থেকে সাহিত্য চর্চা করতে চান, দিল্লির বাংলা সাহিত্য নিয়ে রিসার্চ করতে চান, আমরা তাদের জন্য কোন ওয়েব ফুট-প্রিন্ট রেখে যেতে চাই । দেহ্‌লিজ হবে দিল্লির সাহিত্যের প্রবেশদ্বার ।

প্রশ্ন: পত্রিকাটি ওয়েব ম্যাগাজিন কেন ? ফেসবুকে তো বেশ কাজ চলে যায় ।
উত্তর: দেহ্‌লিজ একটি ফিক্সড অ্যাড্রেস পত্রিকা । কোন একাউন্ট নির্ভর নয় । আর ফেসবুক হল একাউন্ট নির্ভর সোশ্যাল মিডিয়া । কাল যদি ভারত সরকার ফেসবুক কে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে, আপনার ফেসবুক কন্টেন্ট বিপদে পড়ে যাবে ।

প্রশ্ন: পত্রিকাটির লেখক কারা ?
উত্তর: দেহ্‌লিজ কে এখনো পর্যন্ত ভাবা হচ্ছে দিল্লির বাংলা সাহিত্য প্রমোশনের পত্রিকা হিসাবে । তাই দিল্লি এন সি আর অঞ্চলের লেখকদের সাহিত্য যাপনকে গুরুত্ব দেওয়া হবে । বিভিন্ন ক্যাটেগরি রাখা হচ্ছে । দিল্লির বাংলা সাহিত্য গ্রুপ থেকে লেখক ও পাঠকদের স্টাডি করা হচ্ছে, ইন্টারেস্ট গ্রুপ লক্ষ্য রাখা হচ্ছে । সময়ের উপযোগী হিসাবে লেখার মান নির্ধারণ করা হবে । বড়, ছোট, খ্যাত, বিখ্যাত বলে কোন ট্যাগে দেহ্‌লিজ বিশ্বাস করে না । এখানে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সাহিত্য হচ্ছে বলেও কেউ দাবী করছে না । দিল্লির বাংলা সাহিত্য কে রিপ্রেজেন্ট করাই এই উদ্দেশ্য ।  আজ ২০১৮ তে দাঁড়িয়ে দিল্লির লেখকরা যা লিখছেন , সেই অবস্থানটা ধরা হবে ।

প্রশ্ন: পত্রিকাটিতে কি কি বিষয়ে লিখতে পারা যাবে ?
উত্তর: কবিতা, নাটক, প্রবন্ধ, দিল্লির সামাজিক অবস্থা নিয়ে ফিচার আর্টিকেল, গল্প , উপন্যাস , বই রিভিউ, সিনেমা রিভিউ, ফটোগ্রাফি, ইন্টারভিউ প্রকাশ করা হবে ।

প্রশ্ন: পত্রিকাটির পিছনে কোন কোন অ্যাসোসিয়েশনের হাত রয়েছে ?
উত্তর:  পত্রিকাটির পিছনে কোন অ্যাসোসিয়েশনের হাত নেই । ভলেন্টিয়ার বেসড । কোন প্রতিষ্ঠান নেই । বিল্ডিং নেই । কোন ফান্ড নেই ।  চাঁদা নেই ।

প্রশ্ন: পত্রিকাটির সম্পাদক কে ? 
উত্তর: এখনও অব্দি পত্রিকাটির কোন সম্পাদক রাখা হয় নাই । আমি একজন কর্মী হিসবে কো-অর্ডিনেট করছি । 'দিল্লির বাংলা সাহিত্য' নামে যে হোয়াটস অ্যাপ গ্রুপ আছে, সেই গ্রুপ থেকে সাহিত্য আড্ডা হয়, তার উপর বেস করে পত্রিকাটির চরিত্র ও লেখা নির্বাচন করা হবে । পত্রিকাটি সেই সূত্রে বলা যায় 'আড্ডা পরিচালিত' ।

প্রশ্ন: এটা তো পত্রিকা চালানোর সঠিক প্রক্রিয়া নয়, আপনি নিশ্চিত ব্যর্থ প্রচেষ্টা করছেন । 
উত্তর: সঠিক বেঠিক হিসাব করিনি । আমরা ক্রিয়েটিভ লোক , সৃষ্টির আনন্দে কাজ করি । আমাদের কাছে একটাই অস্ত্র সেটা হলো কলম । কলমকে আপগ্রেড করে আমরা এই ওয়েব সাইটে আসছি । আমরা আমাদের সাহিত্যযাপনের উপর ভরসা রাখছি ।  আমাদের কাজ ন্যাচারাল পথে হবে যে ভাবে নদী বেয়ে চলে । নদী যদি পথ না পেয়ে শুঁকিয়ে যায়, ওটাই ন্যাচারাল ।

প্রশ্ন: কবে থেকে পত্রিকাটি প্রকাশিত হবে ? 
উত্তর:  ৬ই মে রবীন্দ্রভবনে বেঙ্গল অ্যাসোসিয়েশনের রবীন্দ্রজয়ন্তী প্রভাতী অনুষ্ঠানের সময় প্রকাশ পাবে এই ওয়েব ম্যাগটি।  দিল্লির বুকে সব চেয়ে বড় বাংলা অনুষ্ঠান । মনে হচ্ছে সমস্ত কবি সাহিত্যিকরা উপস্থিত থাকবেন । আমাদের গ্রুপের ম্যাক্সিমাম এটেন্ডেন্স চাই । আসুন সবাই রবীন্দ্রভবন, কোপার্নিকাস মার্গ , নিউ দিল্লি ।


প্রিয়দর্শী দত্ত

দিল্লি কবে থেকে হিন্দি সাহিত্যের কেন্দ্রবিন্দু হলো?

প্রিয়দর্শী দত্ত


মধ্য দিল্লির চার বাই উনিশ অসফ আলী রোডের উপর অবস্থিত হিন্দি জগতের বৃহত্তম প্রকাশনী সংস্থা ‘প্রভাত প্রকাশন’| তারা সাম্প্রতিক কালে ইংরেজি প্রকাশনা তেও হাত দিয়েছে| উল্লেখযোগ্য ভাবে প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রয়াত শ্রী এ পি জে আব্দুল কলামের প্রায়  সব কটি গ্রন্থ তারাই হিন্দি ও ইংরেজি তে প্রকাশ করেছে| গত ২৩ বছর ধরে প্রভাত প্রকাশন ‘সাহিত্য অমৃত’ নামে একটি মাসিক ও প্রকাশ করে| পত্রিকাটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন সংস্কৃত ও হিন্দির প্রথিতযশা পণ্ডিত শ্রী বিদ্যানিবাস মিশ্র (১৯২৬-২০০৫)|বর্তমানে যাঁর উপর এই ভার ন্যস্ত, তিনি সম্ভবত ভূভারতে প্রবীনতম সম্পাদক| ত্রৈলোক্যনাথ চতুর্বেদী, বয়স নব্বুই, অবকাশ প্রাপ্ত IAS আধিকারিক, ভূতপূর্ব CAG, পদ্ম বিভূষণ প্রাপ্ত, কর্ণাটকের প্রাক্তন রাজ্যপাল| পত্রিকার প্রত্যেক সংখ্যাতে পাঁচ/ছয় পাতা জুড়ে থাকে তার ছয়/সাতটা বিষয়ের উপর সাক্ষরিত সম্পাদকীয় বা সাইনড এডিটরিয়াল|

প্রায় আশি পাতার মাসিকে ওই গুলোই হয়ত দিল্লির নিশ্চিত অবদান| বাকি কাহিনী, কবিতা, প্রবন্ধ ইত্যাদির মধ্যে দিল্লির থেকে একটা আধটা লেখা থাকতেও পারে আবার নাও পারে| বোঝা সহজ কারণ সব লেখার শেষেই লেখক/লেখিকার (হিন্দিতে পরিচয়টা এখনো লিঙ্গ-নিরপেক্ষ হয়ে যায় নি) নাম, ঠিকানা ও মোবাইল নম্বর দেওয়া থাকে| লেখা আসে কানপুর, এলাহাবাদ, লখনৌ, শিমলা, জয়পুর, ভোপাল, ইন্দোর, পাটনা, নাগপুর, পুনে, মুম্বাই, রায়পুর এমন কি বিশাখাপত্তনম থেকে|দিল্লি কি তাহলে সত্যিই এখনো হিন্দি সাহিত্যের উত্পাদক হয়ে উঠতে পারেনি?দেশ পত্রিকা, সাপ্তাহিক বর্তমান, আনন্দমেলা, নবকল্লোলের লেখকদের মধ্যে সিংহ ভাগ হবে কলকাতার বাইরের হবে এটা কল্পনা করা যায়না|

আমার কথা শুনে শম্ভুনাথ হয়ত হাসবেন|আসলে হিন্দি সাহিত্যের ভূগোল টা তো এমনিই| তার লেখকরাও সারা ভারতে ছাড়িয়ে আছেন| তিনি কলকাতা থেকে প্রকাশিত সাহিত্য মাসিক ‘বাগর্থ’ সম্পাদন করেন| কার্যালয় ভারতীয় ভাষা পরিষদ ৩৬ এ, শেক্সপিয়ার সারণী| দেখতে দেখতে বাগর্থের ও প্রায় ২৫ বছর হয়ে গেল, ইতিমধ্যে বেরিয়ে গেছে ২৭৫ টি সংখ্যা| কলকাতার থেকে হিন্দি পত্রিকা? অনেক বাঙালি বাবুই হয়ত হাসবেন| বাঙালিরা সাধারণত ফরাসী, জার্মান ও ল্যাটিন মার্কিন সাহিত্যে কি ঘটছে তা নিয়ে ওয়াকিবহাল হলেও হিন্দি, তামিল, মালায়ালম, অসমীয়া, উড়িয়া তে কি হচ্ছে তা নিয়ে নয়| এ সব ভাষার সাহিত্য বাংলায় বিশেষ অনুদিত হয় না, যদিও বিদেশী সাহিত্যের সম্ভার বেশ সমৃদ্ধ| কিন্তু কলকাতাই ছিল আধুনিক হিন্দির পীঠস্থান| এখানে থেকেই প্রায় দুশো বছর আগে হিন্দির প্রথম সংবাদ পত্র ‘উদন্ত মার্ত্য্ন্ড’ প্রকাশিত হয়| প্রকাশক/সম্পাদক যুগল কিশোর শুক্ল আদপে ছিলেন কানপুরে, কিন্তু কোম্পানি বাহাদুরের চাকরি সূত্রে থাকতে হত কলকাতায়| আধুনিক হিন্দির প্রথম লেখক লাল্লু লালের (১৭৬৩-১৮৩৫) জন্ম আগ্রায়ে একটি গুজরাতি ব্রাহ্মণ পরিবারে হলেও তিনি কর্ম জীবন কাটিয়েছেন কলকাতাতেই| তত্কালীন ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে প্রশিক্ষক ছিলেন| তার বিখ্যাত ‘প্রেম সাগর’ তিনি কলকাতাতে বসে লিখেছিলেন|

আমাদের সময় অলকা সরায়োগী (জন্ম ১৯৬০, কলকাতা) আনন্দনগরী তে বসেই তার ছোট গল্প ও উপন্যাস লিখেছেন| কিন্তু কলকাতায় হিন্দি পত্রিকা বা সংবাদ পত্রের প্রকাশক থাকেল গ্রন্থ প্রকাশক কই? তাই প্রথম দুটি বই – কাহানি কী তলাশ মে (গল্প সংকলন) এবং কলি-কথা ভায়া বাইপাস (উপন্যাস) প্রকাশ করে পঞ্চকুলা-র (হরিয়ানা) এক অল্প শ্রুত প্রকাশক| কিন্তু যেই কলি-কথা ভায়া বাইপাস, ২০০১ সালে সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার পেল, অমনি দিল্লির এক প্রকাশনী সংস্থা রাজকমল প্রকাশন তাকে ধরে ফেলল| আর পঞ্চকুলার প্রকাশকের কাছে ফিরে যেতে হয় নি| দিল্লির প্রকাশকের হাত ধরেই এসেছে একের পর এক লেখা| তিন বছর আগে ২০১৫ ‘জানকীদাস তেজপাল ম্যানশন’ ও রাজকমল প্রকাশ করেছে|

দুই সহোদর ভাই অশোক মাহেশ্বরী এবং অরুণ মাহেশ্বরী স্বতন্ত্র ভাবে রাজকমল প্রকাশন (স্থা.১৯৪৭) ও বাণী প্রকাশন পরিচালনা করেন| এখন মাহেশ্বরী পরিবারের তৃতীয় প্রজন্ম প্রকাশন ব্যবসায়ে নিযুক্ত| এ ছাড়াও আছে রাজপাল এন্ড সন্স, হিন্দি সাহিত্য সদন ইত্যাদি| ডায়মন্ড পাবলিকেশন (স্থা.১৯৪৮) হিন্দি ছাড়া ইংরেজি, বাংলা, উর্দু, মারাঠি, গুজরাটি, অসমীয়া তে ও বই প্রকাশ করে|  

হিন্দি ভাষার ভূগোল টা সারা উত্তর ভারত জুড়ে বিস্তৃত| স্বাভাবিক ভাবে হিন্দি সাহিত্যের বলয়ও তেমনি| হিন্দি ভাষী রাজ্য যেমন ঝাড়খণ্ড, বিহার, উত্তর প্রদেশ, ছত্তিসগড়, মধ্য প্রদেশ, রাজস্থান, হরিয়ানা, হিমাচল প্রদেশ ও উত্তরাখণ্ড তো রয়েছেই| এছাড়া ও আছে পাঞ্জাব, যে প্রান্ত থেকে অনেক হিন্দি লেখক-লেখিকা এসেছেন| উনিশ শতকে আধুনিক হিন্দি ভাষা ও সাহিত্যের যে সব কেন্দ্র ছিল তার মধ্যে এলাহাবাদ, কানপুর, বারানসী, পাটনা ইত্যাদি প্রমুখ| তার মধ্যে কলকাতা ছিল, কিন্তু দিল্লি নয়| দিল্লির উপর মোগল প্রভাব থাকার জন্য উর্দু/ফার্সি ই প্রাধান্য পেয়েছে| দিল্লি মির্জা গালিব, ইব্রাহিম জউখের শহর হিসেবেই পরিচিত ছিল| মোগল যুগ শেষ হওয়ার পর এর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব অনেক কমে যায়| বাংলা, মহারাষ্ট্র, পাঞ্জাব ও সংযুক্ত প্রদেশ (অধুনা উত্তর প্রদেশ) ইত্যাদি তে যে নব চেতনার সঞ্চার হয়, দিল্লি তার থেকে অনেকটা দুরে থাকে|

উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে আধুনিক হিন্দির কথা সাহিত্য অনেকটা বেনারস-এলাহাবাদ-কানপুর অক্ষের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে|ভারেতেন্দু হরিশচন্দ্র ছিলেন বেনারসের, প্রতাপ নারায়ণ মিশ্র কানপুরের|বেনারাসেই তৈরি হয় ‘কাশী নাগরী প্রাচারিনি সভা’| ১৯০০ ক্রী এলাহাবাদের থেকে প্রকাশিত হয় হিন্দির প্রথম সাহিত্য পত্রিকা ‘সরস্বতী’| এর মূলে ছিলেন এক প্রবাসী বাঙালি বাবু চিন্তামনি ঘোষ যিনি ইন্ডিয়ান প্রেস এর প্রতিষ্ঠাতা| প্রসঙ্গত: গীতাঞ্জলী সহ রবীন্দ্রনাথের বহু গ্রন্থের মূল সংস্করণ এলাহাবাদের ইন্ডিয়ান প্রেস থেকেই প্রকাশিত হয়| আধুনিক হিন্দি সাহিত্যের নির্মাণে ‘সরস্বতী’ পত্রিকার ভূমিকা অতুলনীয়| মেদিনীপুরে বড় হয়ে ওঠা হিন্দির মহীরুহ কবি সূর্য কান্ত ত্রিপাঠি ‘নিরালা’ (১৮৯৬-১৯৬১) বলেছিলেন যে তিনি হিন্দি ভাষা সরস্বতী পত্রিকা পড়েই শিখেছিলেন|

কাশী নাগরী প্রচারিনি সভার আনুকূল্যে বেনারস থেকে হিন্দি সাহিত্যের অনেক গুলি সংকলন বেরয়| সে যুগে ছিল হিন্দি সাহিত্য প্রেস(এলাহাবাদ), ভারতী ভাণ্ডার/লিডার প্রেস (এলাহাবাদ),   গঙ্গা গ্রন্থাগার (লক্ষ্ণৌ), মুন্সী প্রেমচাঁদ নির্মিত সরস্বতী প্রেস (বেনারস) ইত্যাদি| হিন্দিতে রহস্য রোমাঞ্চ উপন্যাসের প্রথম স্রষ্টা ‘চন্দ্রকান্তা সন্ততি’ খ্যাত বাবু দেবকী নন্দন ক্ষত্রি (১৮৬১-১৯১৩)বেনারসে ‘লহরী প্রেস’ প্রতিষ্ঠা করেন| মূলত: বিহারের সমস্তিপুরের হলেও তিনি কর্মসূত্রে বেনারসে থাকতেন| লহরী প্রেস থেকে প্রকাশিত গ্রন্থে প্রকাশকের জায়গায় ইংরেজি তে জনৈক পান্না লাল রায়, ম্যানেজার, লহরী প্রেস  লেখা থাকত| Roy লিখতেন বলে অনুমান করি তিনি বাঙালি হতে পারেন| 

দিল্লিতে ১৮৫৭ এর পর মোগল শাসন শেষ হলেও প্রায় অর্ধশতাব্দী হিন্দি সাহিত্যের কোনো উন্মেষ দেখা যায় নি| ওদিকে উত্তর প্রদেশে তখন আধুনিক হিন্দি সাহিত্যের (গদ্য, প্রবন্ধ সাহিত্য, কাহিনী) দ্রুত বিকাশ হচ্ছে| তৈরি হচ্ছে মুদ্রণশালা|ভারতের রাজধানী ১৯১১ সালে দিল্লীতে স্থানান্তরিত হলো| বাস্তবে এই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হতে অনেক সময় লাগে| আর সমাজের স্বামী শ্রদ্ধানন্দ (মহাত্মা মুন্সী রাম)১৯১২ সালে দিল্লীর প্রথম হিন্দি দৈনিক ‘বিজয়’ এর সূচনা করেন, পরবর্তী কালে ১৯২৩ এ তিনি ‘অর্জুন’ এর প্রতিষ্ঠা করেন| এই দুই পত্রিকার মাধ্যমে দিল্লির প্রথম হিন্দি সাংবাদিক পণ্ডিত ইন্দ্র বাচস্পতি খবরের শিরোনামে চলে আসেন| ইনি পরে সাহিত্যিক রূপেও খ্যাতি অর্জন করেন| কিছুদিনের মধ্যে রামচন্দ্র শর্মা ‘মহারথী’ নামে এক সাপ্তাহিকের সম্পাদনা শুরু করেন| এবং কালান্তরে এই সাপ্তাহিক ই দিল্লির হিন্দি সাহিত্যের কেন্দ্র বিন্দু হয়ে দাঁড়ায়ে|

দিল্লির বহুসংখ্যক মানুষের কথ্য ভাষা চিরকাল হিন্দি ই ছিল| এবার যখন মনে হচ্ছিল সাহিত্যের কেন্দ্র বিন্দু তেও অচিরে হিন্দি উঠে আসবে, ঠিক সেই সময়ই একটা ঘটনা ঘটল যা হিন্দি কে সরিয়ে আবার উর্দু কে চাঙ্গা করে দিল| ঠিক ১৯৩৫ সালে গুলাম আলী বুখারী (১৯০৪-১৯৭০) দিল্লি রেডিও স্টেশনের ডিরেক্টর হয়ে আসেন| তিনি মূলত: পেশোয়ার এর ছিলেন এবং দেশ ভাগের পর পাকিস্তান রেডিওর প্রথম ডিরেক্টর-জেনারেল হন|১৯৩৫ থেকে ১৯৩৯ এই চার বছরে তিনি দিল্লির রেডিও স্টেশন কে উর্দু সাহিত্যকার দের আখড়া তৈরি হয়ে যায়| সরকারি কাজ কর্মে তো এমনি উর্দু চলে আসছিল| তাই হিন্দি সাহিত্যিকরা নিজের জায়গা তৈরি করতে পারছিল না|

কিন্তু ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শুরু হতেই রাজধানীর জীবন যাত্রায় যে বহুমুখী পরিবর্তন হলো হিন্দি সাহিত্য তার দ্বারা লাভবান হলো| যুদ্ধের জন্য নতুন কর্মসংস্থান হলো| ব্রজভাষার কবি বিয়োগী হরি (১৮৯৫-১৯৮৮) মূলত: মধ্য ভারতের হলেও ১৯৩৪ থেকে দিল্লি তে থাকছিলেন| তিনি আরো কয়েকজন উদীয়মান লেখকদের নিয়ে একটি আন্দোলন গড়ার চেষ্টা করলেন| এই দলটির মধ্যে ‘ঈশ’-অন্তক নামের ছড়াছড়ি ছিল – যেমন ছবেশ, দীনেশ, করুনেশ, কমলেশ ইত্যাদি|  এই সময় দিল্লির প্রথম হিন্দি উপন্যাসকার রামচন্দ্র তেওয়ারীর উদয় হলো| এ ছাড়া ও ব্রজ ভাষার হাস্য রসের কবি গোপাল প্রসাদ ব্যাস (১৯১৫-২০০৫) দিল্লীতে ঘাঁটি গাড়েন| প্রসঙ্গত সুভাষ চন্দ্র বসুর প্রশংসায়ে লিখিত তার একটি কবিতা বিখ্যাত হয়|

এই সময় দিল্লির বাইরে থেকে আসা অনেক কবি সাহিত্যিকরা এই শহর কে ঘাঁটি করে সাহিত্যচর্চা আরম্ভ করেন|তৈরি হয় ‘কবি সমাজ’ আর ‘নয়ী দিল্লি হিন্দি সাহিত্য সভা’| এত দিন উর্দুর মুশায়রা হত| এবার তারই অনুকরণে শুরু হলো হিন্দি কবি সম্মেলন, যা দিল্লির অবদান|  এই কবি সমাজের মধ্যে এত বিভিন্ন পেশার মানুষরা ছিলেন যে শুনে আশ্চর্য হতে হয়- কেরানি, লোহার ব্যাপারী, পুস্তক বিক্রেতা, ধর্মীয় কথাবাচক, অধ্যাপক, ডাক্তার, কম্পউণ্ডার, দর্জি ইত্যাদি| তাদের মাসে একবার করে সাহিত্য বৈঠক হত| কোজাগরী লক্ষ্মী পূজার রাতে (শরদ পূর্ণিমা) যমুনায় হত নৌকা বিহার| তারাই দিল্লির জনগণ কে কবিতা মুখী করে তোলেন| রাজেন্দ্রলাল হাঁন্ডা তার স্মৃতিচারণ ‘দিল্লি মে দশ বর্ষ’-এ তার বর্ণনা দিয়েছেন|

উনিশশো সাতচল্লিশ সালের ১৫ই আগস্ট স্বাধীনতার সঙ্গে রক্তক্ষয়ী দেশ ভাগ ও হলো| অবিভক্ত পাঞ্জাব প্রদেশের অর্ধেকটা পশ্চিম পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হলো| এর সঙ্গে সঙ্গেই সেখানে থেকে বিতাড়িত হিন্দু ও শিখেরা, যারা জীবিত পৌঁছুতে পারল, এসে দিল্লীতে শরণ নিল| ওদিকে দেওয়াল ঘেরা দিল্লির (walled city) অংশ থেকে অনেক মুসলমানদের দিল্লি ছেড়ে চলে যেতে হলো| দিল্লির জনসংখ্যার ভাষাগত এবং ধর্মীয় বিন্যাস অনেকটাই বদলে গেল| এতে হিন্দি সাহিত্যের লাভ হলো ও উর্দু সাহিত্যের রমরমা অনেক কমে গেল| অন্য দিকে স্বাধীন ভারতে হিন্দি কে সরকারি (official language) ভাষা ঘোষণা করার বিতর্কিত সিদ্ধান্তে হিন্দির কদর বেশ বাড়লো|

সে সব হিন্দু ও শিখ শরণার্থী দিল্লি এসে পৌঁছেছিলেন তাদের কথ্য ভাষা পাঞ্জাবি ছিল| কিন্তু সে যুগে পাঞ্জাবে ইংরেজির পর লিখিত ও শিক্ষার ভাষা উর্দু ছিল (পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত পাঞ্জাবে এখনো তাই)| ভারতীয় পাঞ্জাবে গুরুমুখীর সরকারি ভাষা হয়ে ওঠার কাহিনী (যা নিয়ে অনত্র আলোচনা করব) স্বাধীনতার অনেক পরের কথা| অবিভক্ত পাঞ্জাবে গুরুমুখী মূলত: শিখেদের ধর্মীয় ভাষা ছিল, যা না স্কুলে পড়ানো হত, না তাতে বিশেষ সাহিত্য রচনা হত| গুরুমুখী তে লেখা পাঞ্জাবি সাহিত্য কুড়ি শতকের, এমন কি স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ের সৃষ্টি| কিন্তু স্বাধীন ভারতে পাঞ্জাবিরা উর্দুর দিকে কেন গেলেন না?

উনিশ শতকের শেষ দিকে আর্য সমাজ পাঞ্জাবের হিন্দু সমাজের উপর প্রভাব বিস্তর করতে শুরু করে| শিক্ষার ক্ষেত্রে আর্য সমাজের বিশেষ ভূমিকা ছিল| আর্য সমাজ প্রচণ্ড ভাবে হিন্দির প্রচার শুরু করেছিল|আর্য সমাজ তৈরির আগের থেকেই (১৮৭২) ব্রহ্মানন্দ কেশব চন্দ্র সেনের পরামর্শে জন্মসূত্রে গুজরাতি ব্রাহ্মণ স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী সর্জাবানিক ব্যবহারের জন্য সংস্কৃত ছেড়ে হিন্দির শুরু করেছিলেন| জনগণনায়ে পাঞ্জাবের হিন্দু দের জিজ্ঞেস করলে তারা বলত তাদের ভাষা হিন্দি| এর জন্য স্বাধীনতার পরে ভারতীয় পাঞ্জাবে একটি বিতর্কও সৃষ্টি হয়| কিন্তু লক্ষ্য করবেন এই পাঞ্জাবী হিন্দুদের মধ্যে থেকেই হিন্দি সিনেমা জগতের বহু গান লেখক এসেছেন- গুলজার, আনন্দ বকশী, গুলশন বাবরা (গুলশান কুমার মেহতা), রাজেন্দ্র কৃষ্ণ ইত্যাদি|

স্বাধীনতার পরে দিল্লির হিন্দি সাহিত্য কে সমৃদ্ধ করলেন এক পাঞ্জাবি কাহিনীকার ও নাট্যকার| তাঁর নাম মদন মোহন গুগ্লানি  (১৯২৫-১৯৭২) যিনি মোহন রাকেশ নামে খ্যাত হন| তাঁর হিন্দি নাটক আষাঢ কা এক দিন, লেহরো কে রাজহন্স এবং আধে আধুরে ইত্যাদি কেবল দিল্লীতে কেবল মাত্র হিন্দি নাটক কে চাঙ্গা করে না, তাঁকেও হিন্দির প্রথম আধুনিক নাট্যকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে| তার ছোট গল্প গুলি ও মর্মস্পর্শী| মাত্র ৪৭ বছর বয়েস যখন দিল্লীতে তাঁর মৃত্যু হয়, তিনি প্রথম সারির হিন্দি লেখকদের মধ্যে পরিগণিত হতেন|

দেশ ভাগের কারণেই দিল্লীতে এলেন অমৃতা প্রীতম, কৃষ্ণা সোবতি, ভীস্ম সাহানি| অমৃতা পাঞ্জাবি সাহিত্যের একজন পথিকৃৎ ছাড়াও হিন্দির লেখিকা| কৃষ্ণা সোবতি হিন্দির বিশিষ্ট উপন্যাসকার, প্রাবন্ধিক| জীবিকার জন্য এসেছিলেন হরিবংশ রাই বচ্চন, শ্রীকান্ত ভার্মা, নির্মল ভার্মা, মনোহর শ্যাম যোশী, কেদার নাথ সিংহ, রাজেন্দ্র যাদভ, মৃদুলা গর্গ, প্রয়াগ শুক্ল ইত্যাদি| দিল্লিতে অনেক সরকারি চাকরি| এ ছাড়া দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়, জহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়, সাহিত্য একাডেমী, হিন্দি একাডেমী ইত্যাদি থাকায়ে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা বিদ্যমান| দিল্লির থেকে বহু সংবাদ পত্র, পত্রিকাও বেরুতে থাকে| 

রাজধানী হওয়ার দৌলতে দিল্লির ভাগ্যে অনেক কিছু জুটেছে| কিন্তু হিন্দি সাহিত্য কে যদি আমরা শুধু দিল্লির দৃষ্টি দিয়েই দেখি তাহলে বুঝতে হবে মস্তিষ্কে রক্ত জমে গেছে| দিল্লি একটা কৃত্রিম জিনিষ| দিল্লিতে কোনো প্রেমচাঁদ, জয়শংকর প্রসাদ, নিরালা তৈরি হতে পারেন না| দিল্লির থেকে দুরে বসেও মহাদেবী বর্মা, অমৃতলাল নাগর, হরিশংকর পরসাই, শ্রী লাল শুক্লা, শিব মঙ্গল সুমন, সুমিত্রা নন্দন পন্থ ইত্যাদি সাহিত্যকার প্রসিদ্ধ হয়েছেন| হিন্দি গজলের সৃষ্টিকর্তা দুষ্মন্ত কুমার (১৯৩৩-১৯৭৫) যার কাব্য গ্রন্থ ‘সায়ে মে ধূপ’ কে ইন্দিরা গান্ধীর জরুরী অবস্থার বিরুদ্ধে এক সুতীক্ষ্ণ সমালোচনা বলা হয় উত্তর প্রদেশ ও মধ্য প্রদেশে কাজ করেছেন| নাট্যকার শঙ্কর শেষ (১৯৩৩-১৯৮১) ছত্তিসগড় থেকে স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ায় হিন্দি অফিসারের কাজ নিয়ে মুম্বাই চলে যান| কমলেশ্বর, শরদ যোশী ও মনোহর শ্যাম যোশী ও সিনেমা – টেলিভিশন সিরিয়াল এর লেখনর সুবাদে মুম্বাই তে ছিলেন|

ইতিহাসের দিক থেকে দেখতে গেলে হয়তো ‘সস্তা সাহিত্য মণ্ডল’ যা ১৯২৫ এ গান্ধীজীর ইচ্ছাতে এবং ঘনশ্যাম দাস ও যমুনালাল বাজাজের আনুকূল্যে তৈরি হয় দিল্লির প্রথম হিন্দি প্রকাশন| কনৌট সার্কাসে তাদের অফিস আজ ও চলে আসছে| কিন্তু দিল্লিতে হিন্দির প্রথম সারির প্রকাশনী সংস্থান গুলি বেশির ভাগ ই স্বাধীনতার পরের| এর মধ্যে প্রভাত প্রকাশন, রাজকমল প্রকাশন, বাণী প্রকাশন, রাজপাল এন্ড সন্স কিতাব ঘর ইত্যাদি| এটা কি পুঁজিবাদের প্রভাব? দিল্লিতে মুদ্রণ সস্তা, পেশাদার ও কর্মচারী পাওয়া যায় এবং একটি পাঠকবর্গ আছে যাদের হাতে টাকা আছে| এ ছাড়া রাজনৈতিক দিক ও আছে| প্রভাত প্রকাশন কে যেমন ভারতীয় জনতা পার্টির কাছা কাছি মনে করা হয়| কিন্তু আমার ব্যক্তিগত ধারণা হিন্দির সাহিত্যের আসল কাজ দিল্লির বাইরেই হচ্ছে| প্রকাশকরাও তার খবর রাখেন| তাদের প্রকাশিত বইয়ের লেখকরা বহুলাংশে দিল্লির বাইরের|

Friday, May 4, 2018

কৃষ্ণা মিশ্র ভট্টাচার্য

জঙ্গলফায়ার  একটি অলৌকিক ঘোড়া এবং এক জোড়া শালিখ

কৃষ্ণা মিশ্র ভট্টাচার্য


আগুনরা মরে গেছে
চারপাশে হাউলিং হলুদ

পশ্চিম ও পূব দুদিকেই লাল।তবে ক্যানভাস আকাশে রং দুটির ছোপ কিছু কিছু আলাদা। পূবের রং জ্বলন্ত হলুদ—এতক্ষণ আগুন রং ছিল—এখন ডিমের কুসুম পশ্চিমে লাল ছোপ মুছে এখন অন্ধকার মাখছে। এমনটাই ধূসর  সন্ধ্যা। গেষ্ট হাউসের সাদা মর্মরে গ্রাফিত্তি ওরা দুজন।মাঝখানে পাথরের টেবিল- দুদিকে দুটি বেতের চেয়ারে ওরা। মুখোমুখি তবে একে অপরকে দেখছিল না।যেন দুজন বসে আছে দুজন কে নিয়ে আবার নেই ও। আসলে ওদের দুজনের মঝখানে ঢুকে পড়েছিল তৃতীয় কোন ও রং, সময় অথবা আগুন।
ওরা একে অন্যের সঙ্গে কথা বলছে; আবার বলছে ও না ওদের সংলাপ ণ্ডলো পাতা ঘাস লনে, মোজায়েক মসৃণ বেডরুমে , নীল বেডস্প্রেডে এভাবে বাজতে থাকে
--- ‘ বাঁশের সাঁকো টা দুলছে’ 
--- ‘ বনভূমি ময় পাতাঝরা বসন্ত’ 
-‘ আঙ্গুলে আঙ্গুল রাতলিপি নির্যাস যাদুঘর’ 
দুজন চুপচাপ।চায়ের পেয়ালায় ছোট্ট চুমুক। রোদ মরে যেতে অন্ধকারে নিষিদ্ধ ভুবন ।
--- ‘ তিনটে দমকল!’ 
-‘ তাও আগুনটা পুরোপুরি নেভেনি
--- ‘ এতো ধূমল, পাংশুল আকাশ’ 
আগুন তো তাই – 
-আগুন কি সব পোড়ায়—
- কিছু কিছু মথন গন্ধ
একলা জামা, সাগর জল
ধানের বোঁটায় দুধ---- 
‘ সমূহ আণ্ডনে যখন পুড়ছে ঘর বসত তুমি কি তখন 
কবিতা—
‘ নিম্ন নাভি কড়িযোনি মুদ্রার আকাশে
ম্যামথ বাড়ি লাঞ্ছিত আকাশ’ 
আগুন কি পোড়ায় জল যান? 
কথা শরীর উদোম? 
পা ঘষটে ঘষটে সন্ধ্যা নামছে।সন্ধ্যা নামলে কি এমন শব্দহীন আকাশ, পাখিরা ডানা ঝেড়ে শরীর থেকে খুলে নিচ্ছে উড়ান জনিত ক্লান্তি; কোলাজ আকশে এখন কিছু লাল মেঘের টুকরো।চপ্পল ঘষটে ঘষটে
সাব , ডিনার কে লিয়ে ক্যায়া মাঙ্গাউ ? 
কুছ ভী বনা লো
গাঁও যানা পড়েগা ।আন্ডা অৌর চিকেন লে আউ? 
কিতনা দূর? 
তিন চার কিলোমিটার হোগা
ক্যায়সে যাওগে? 
ভটভটিয়া হ্যায় না
উধার আগ---- 
হাঁ সাব আভি ভি বুঝা নেহি।
ক্যায়সে লগা আগ? 
ক্ষয়াটে চোখে মায়োপিক হাসি
আরে সাব জঙ্গল মে ইস টেইম পেঁ আগ তো লগতাই রহতা হ্যাঁয়
হূ ।ডেনজারাস্
কুছ ডেনজার নেহী হ্যাঁয় সাব।জঙ্গল মে জব্ গরমি জ্যায়দা হোতি হ্যাঁয় না তব আপনা আপ আগ লগ্ যাতি।
তো সাব ম্যঁয় চলা
ওয়ালেট খুলে একগোছা নোট ণ্ডঁজে দিল ওরা।নোট ণ্ডলিকে বসন্ত বাতাসের এলোপাথাড়ি পাগলামো থেকে বাঁচাতে জীর্ণ কালো আদিবাসী ভুখা হাত দুই হাতে সাপটে ধরে।।
সাব জঙ্গল দেখতে আসিয়েছেন তো দেখে লিন। জঙ্গল ভী তো এক আওরাত্ হ্যাঁয় সাব। বহুত দিল্লাগি বহুত মস্ত্ বহুত প্যার ভী হ্যায় সাব
ওরা চমকে ওঠে। জঙ্গলের আলো আধাঁরি ওদের মাপে। ওরা দুজন দুজনকে মাপে।
----শহর ক্লান্ত চোখে হতাশার তমিস্রা
প্রতিদিন যাপনের হর্ষকামী 
বিষাদ গ্রন্থি সকল
----যাপন না যাপনের হলুদ রোজনামচা
----জটযান নগ্নতায় সেপিয়ান্স হল্লাবোল
----টিটেনাস সলিউশনে ভেজানো ক্লান্ত স্লিপিং গাউন
রাত গভীর হলে আগুন নিভে যায় 

স্বাধীন বাতাস খেলা করে
বিপ্লবী চেতনায়----

খাওয়া টা একটু বেশীই হয়ে গেল।
লোকটার রান্নার হাত ভাল
এতো বড় একটা গেষ্ট হাউসে আমরা দুজন
তোমার বুঝি ভয় করছে?
ভয় করছে বললে তুমি বুঝি খুশী হবে?
উফ্। কি কথার কি জবাব।
থাক্। আমরা প্যাচ আপ করতে এসেছি
জীবনের প্যাচ আপ এতো সহজ নয়।
মাঝখানে নীরবতা নেমে এলে ঝরা পাতারা দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
একটা ব্যাপার লক্ষ্য করার মতো—
কী
এখানে ইন্টারনেট কাজ করছে না।
ফোন কানেকটিভিটি নেই—
দারুণ!
হয়তো অনেক ইমপোরট্যান্ট কল মিস করছি
জীবনের থেকে ইমপোরট্যান্ট কিছু আছে কী?
ট্রেকিং কলার লাগানো জন্তর  মতো আমরা হারিয়ে ফেলছি আমাদেরব্যাক্তি সত্ত্বা
সেপটিক ধরা ঝিমন্ত মগজে যখন রোবটিক ভালবাসা 
এখন এক মুহুর্তের জন্য আমরা পলাতক স্বেচ্ছ্বাচারী বাতাস----
বলো না ,বাতাস ও এখন ডাটা বন্দী ।আকাশ ও এখন পর্যবেক্ষণ কাঁচের আওতায়
হুররা –লেট আস্ এনজয় আওয়ার স্বাধীনতা। 
ওরা সেই আদি অরণ্যে অরণ্যচর প্রথম মানব /মানবী। হাঁটতে হাঁটতে ওরা জঙ্গল ফায়ারের মুখোমুখি।
ইস, অনেক গাছ মরে গেছে 
- অনেক পাখি,অনেক হরিণ, অনেক বাইসন
আরো জঙ্গলের গভীরতায় ওরা ।দীঘল অরণ্য ক্রমশঃ ওদের রাত শরীরে ঢুকে যায়।অমলতাস হলুদ এখন ঘাস জমিতে 
‘ দ্য, ওয়েট ওব দ্য ওয়ার্ল্ড 
ইজ লাভ
আন্ডার দ্য বার্ডেন ওব 
সলিচিউড
আন্ডার দ্য বার্ডেন ওব
ডিসস্যাটিসফেকশন’ 
এসো একটু বসি।ওরা দুজন পাশাপাশি।
 - কতো দিন এভাবে হাতে হাত রেখে বসা হয় নি।
- কতোদিন এভাবে নিস্তব্দ্ধতা শোনা হয় নি।
-- ‘ হোয়াট স্ফিঙ্কস্ আ্যন্ড সিমেন্ট আ্যন্ড আ্যলুমিনিয়াম ব্যাস্ড ওপেন দেয়ার স্কাল্পস্ আ্যন্ড এইট আপ দেয়ার ব্রেইনস আ্যন্ড ইমাজিনেশন--- ;’  
- এই অরণ্যে না এলে আমি নিজেকে চিনতে পারতাম না 
এই অরণ্যে না এলে আমি ভালবাসার হাত ধরতে পারতাম না
সাবওয়ের প্যাঁচলো সভ্যতা আমাদের গলা টিপে ধরেছিল
হঠাৎ একটা পায়ের শব্দ ওদের চকিত করে।ওরা আধো অন্ধকারে কান পাতে।
ঘোড়ার পায়ের শব্দ না? – 
ঠিক বলেছ
এখানে ঘোড়া? 
অপূর্ব সাদা একটি স্বপ্নের ঘোড়া ওদের সামনে--- তার নীল দুটি চোখ থেকে ঝরে পড়ছে জোছনা মাখা চাঁদের মদ—তার মুখের চারপাশে অভ্র কাঁচ স্বেদ বিন্দু।
ঘোড়াটি র বল্গা ধরে ওদের  সামনে এক পুরুষ ঘোড়া থেকে নেমে এলেন।মধ্যযুগীয় সামন্ত নৃপতির মতো তাঁর পোষাক—
--‘ এই বনভূমিতে তোমাদের স্বাগত জানাই।
আপনি কে? 
অশ্বারোহীর চোখে কৌতুক।
আমি এই অরণ্যের সন্তান।
আপনার পোষাক টা তো--- 
স্মার্ট সিটি,সাইবার কাফে কিংবা ইন্টারনেট যুগের উপযুক্ত নয় তাইতো? 
অশ্বারোহী এবার ঘোড়াকে একটি শাল গাছে আলতো করে বেঁধে ওদের মুখোমুখি।
এ আমার ঊচ্চৈশ্রবা।
ইন্দ্রের ঘোড়া--- 
আমিই ইন্দ্র--- 
ইন্দ্র তো মিথ--- 
তাই নাকি? তাহলে নানাসাহেব—
আ্যঁ-----সিপাহী বিদ্রোহের সেই নায়ক যাকে ইংরেজ রা কখন ও ধরতে পারেনি--- 
তাহলে ধরে নাও আমি কানু মাঝি
কানুমাঝি? 
এবার অশ্বারোহীর চোখে বিদ্যুৎ--- গলায় তীব্র শ্লেষ /বিলাপ/ রাগ/রিরংসা/হতাশা—
নাম শোননি বোধহয়? সাঁওতাল বিদ্রোহের মহানায়ক কানুমাঝি—টাঙ্গি আর তীরধনুক নিয়ে গোরাদের সঙ্গে লড়াই করেছিল—শেষতক্ পারেনি বটেক—গোরারা তাঁকে ধরে এই জঙ্গলে ফাঁসি দিয়েছিল-- ।এই অরণ্য আমার,আমাদের – যারা এই অরণ্য কে আমাদের হাত থেকে কেড়ে নিতে চাইবে আমার সংগ্রাম জারি থাকবে তাদের বিরুদ্ধে--- এই অরণ্যকে যারা ধ্বংস করতে চাইবে আমদের সংগ্রাম তাদের বিরুদ্ধে—আমি এই বৃক্ষ,এই জোছনা,এই পাহাড়ি ঝর্ণা,এই অরণ্যচর পশু পাখি নদী মানুষের  বেঁচে থাকার অধিকার চাই—এই অরণ্যের অধিকার চাই---- 
ঊচ্চৈশ্রবা দুবার সাংকেতিক  হ্রেষাধ্বনী করতেই  অশ্বারোহী  তড়িৎ গতিতে ঘোড়ার পিঠে চেপে গাছেদের মাঝখানে মিলিয়ে গেল।
ওরা দুজন জঙ্গল ফায়ারের নিভে যাওয়া আলোয় জোনাকির খেলা খেলতে খেলতে অরণ্যে হারিয়ে গেল---- ওরা ক্রমশঃ অরণ্য হয়ে যেতে লাগল----


পীযূষকান্তি বিশ্বাস

দিল্লিলিখন

পীযূষকান্তি বিশ্বাস 


আমাকে লিখতে হবে আর এক পৃথিবী
বীজ থেকে শুরু করে তরুরাজির পর্ণমোচী হওয়া
রৌদ্র থেকে চুষে নিয়ে
রসে রসে আপন গোপন অক্ষরে
লিখতে হবে আমায় এক সঞ্জীবনী বানী
পাতায় পাতায় সাংকেতিক বাক্যবন্ধনে
লিখে যেতে হবে আমায় দিল্লির এক বিনির্মাণ কাহিনী ।

এখনো আছে সেই জারণের অদ্ভুত রসায়ন
গলে যাওয়া মুখের ভিতর জিহ্বা কশিকায়
পিচ্ছিল হয়ে এলে বাল্কল সকল
এই চৈত্রে খিল খিলিয়ে
সবুজে সবুজে ঋতুমতী হয়ে ওঠে বুদ্ধজয়ন্তী পার্ক
স্তূপ থেকে জেগে ওঠে পাথুরি খনিজ
আমাকে লিখতে হবে অন্য পৃথিবীর আরাবল্লি রিজ

এক পৃথিবী মানে অনেক রচনা,
অক্ষর বিন্যাস
ধোলাকুঁয়ার উপর দিয়ে মুড়ে যায় যে মেট্রো ট্রেনলাইন
অপলক তাকিয়ে থাকি
ওড়না উড়িয়ে
এই গরমে কলেজ ফেরত কোনো ললনার দ্রুত চলে যাওয়া

কোথাও থেকে তার চুলের খুশবু হাওয়ায় উড়ে আসে
চলন্ত ট্রাফিক থমকে দাঁড়ায় এই তপ্ত শহরে
ঝান্ডেবালান হয়ে ঘূর্ণিপাকে যে ধুলো ঘিরেছে রাজপথ
যে ধুলো কোনোদিন উড়িয়েছিল তীব্র বেগে ধেয়ে আসা
শেরশাহের অশ্ববাহিনী
এতটা সহজ করে লিখতে পারিনি কখনো সুলতানি ইতিহাস
জলের মতো করে বুঝিনি কখনো মুঘলের সাম্রাজ্যবাদী ভাষা
এই যমুনার কৃষ্ণকালো স্রোতে
যখন আমি লিখতে চেয়েছি
কোন এক গুর্জর বালিকাবধুর হারানো কানপাশা ।

এক পৃথিবী লিখতে গিয়ে দেখি উদাসীন পাঠকের মুখ
সান্ধ্যকাল উপনীত হয় সফদরজঙ্গের চুড়ায়
দেখি জ্যোৎস্নার বিবর্ণযাপন
এক পৃথিবী লিখতে গিয়ে দেখি অন্ধকারে ঘনীভূত
পুরানো দিল্লির পণ্যবিপনন
চাঁদনি চক জেগে আছে হারেমের কন্যাদের গোঙানী সমেত
কপাল থেকে খসে পড়ে উপমা সংকেত
কোথাও পৌঁছাতে চায় রাত,
কোথায় চুপ হয়ে যায় ভাষা
কোথাও বাক্যেরা ফুরিয়ে যায় ঠোটে
রিংরোড বরাবর তবু সারি সারি লাইন বাই লাইন
মির্জা গালিবের পঙক্তি জ্বলে ওঠে ।


দেহ্‌লিজ


পা-খানি ওঠাতেই হয়,
পার করতে হলে দ্বার ,
পা'কে হয়ে উঠতে পারদক্ষী
আর যেখানে দরজা আর তার অনতিক্রম্য রেখা
পাকে সুরক্ষিত রাখতে এই তার এতটুকুই অঙ্গীকার
নিজেকে বন্ধ্যা রেখে অংকুর-সম্ভাব্য সেই বীজ
ঘরের সাথে ঘর করে যাচ্ছে সে
                             একান্তে দেহ্‌লিজ ।

হায় দরজা,
এ কিসের অহংকার
নাকি অহরহ গ্রীবার উপরে আটকে থাকা ভয়
                  অলক্ষ্যে চৌকাঠ বেড়ে যাওয়ার ?
একবার পিছন ফিরে যদি দেখো , সংসার
নিজেকে টপকে যাওয়া আর
                        হয়না দরজার ।

এভাবেও কি গণ্ডী এঁকে দেওয়া যায় ?
দৈর্ঘ্যে প্রস্থে বা যে কোন মাত্রায়
             মাইল থেকে মাইল
ভিতরে ভিতরে তবু গোপনে হেঁটে যাওয়া যাত্রায়
আমাদের এইতো বিচরণের সংজ্ঞা ,
এই তো আমাদের জমি, এই তো আমাদের আল
শৈশব থেকে হেঁটে আসা ধ্বনি তরঙ্গের সাথে
ভেঙ্গে যাওয়া        বয়ঃসন্ধি কাল ।

এটাই তো চেয়েছিলে পিতামহ, প্রপিতামহ,
                               সমস্ত পরিবার
দেহের প্রতিটা অঙ্গ কোষকে সুরক্ষা দিতে
বল্কলে ঘিরেছিল পরিধান
ঘরের নিরাপত্তাকে তাই ভেবেছিলো অগ্রাধিকার

নাকি আরও কিছু ছিল গোপন বক্তব্য
অলিখিত কোন সীমানা, কোন মাপজোক
যার জন্য চৌকাঠের হয়েছিল এক বোধ
নিজেই সে উঠিয়েছিল পা
নিজের কর্তব্যকেই সে
                   ভেবেছিলো দরজা

পা,
যে কোন দায়িত্ব বিশেষ
ঘরকে ডিঙ্গিয়ে যেতে চেয়ে
পার করে যেতে চেয়েছিল যে সীমানা
যাকে অধিবাসীরা ভেবেছিলো দেহ্‌লিজ
যাকে অতিক্রম করতে চেয়েছিল ঠিকানা

পার
তো করে যেতে হয় সমস্তকিছু একদিন
কারণ দেওয়ালেরও আছে এক জীবনচক্র
             মৃত্যুরও আছে এক অতীত
জঙ্ঘার ও আছে এক আয়ু,
             সীমানারও আছে এক মিথ

অপার বিশ্বাস,
অপার সীমানা নিয়ে এই বোধ
উদ্যত পা নিয়ে সমস্ত লড়াই
অন্তত: একবার তাই চৌকাঠ ভেঙ্গে
দেহ্‌লিজ পার করে যেতে চাই ।


Thursday, May 3, 2018

ঝুমা চট্টোপাধ্যায়

গোরক্ষপুর এক্সপ্রেস

ঝুমা চট্টোপাধ্যায়


কিছুদিন হল আমার বাবা নাকে ঠিকমত নিঃশ্বাস পাচ্ছেন না । নিঃশ্বাসগুলি তাঁর নাক পর্যন্ত এসে বাইরে থেকে ফিরে যাচ্ছে ।  ঠাট্টা না , সত্যি ।
এই তো কিছুক্ষণ আগে আমি সোমার সঙ্গে বসে গল্প করছি , শুনলাম বাবা কাকে যেন দুঃখ করে বলছেন , যাঃ ঐ চলে যাচ্ছে , আর ধরা গেল না !
সোমা মাঝে মাঝে আমাদের বাড়ি বসতে আসে ।  কোন দরকার না , এমনি ।  পৌনে দুটা বাজলে চলে যায় । সোমাকে বললাম , বোস তো একটু , গিয়ে দেখে আসি বাবা কার সঙ্গে কথা বলছে !
আমাকে দেখেই বাবা বললেন , সামরিন , তোর আম্মিকে একবার পাঠিয়ে দে তো ! আমার আজ খিদা নাই । দুপুরে কিছু খাব না । ’

এখন তো সবে দশটা আব্বু ! দুপুরের অনেক দেরি । তুমি গোসল করেছ ? না করলে , যাও উঠ । গিয়ে ভাল করে গোসল করে এসো ।

আমাদের বাড়িতে তিনটা চৌবাচ্চা । একটা ছোট আর বড় দুইটা । ছোটটা আন্ডারগ্রাউন্ড । জল খুব ঠাণ্ডা । বাবা অবশ্য বারোমাস গরম জলেই গোসল করেন । ডাক্তার বলে দিয়েছে ।
তুমি কার সঙ্গে কথা বলছিলে আব্বু ? শুনতে পেলাম !
কারুর সঙ্গে না । তোর আম্মিকে ডাক দে ! বল যে আমি ডাকছি । এখনই ।

আমার আম্মি কুলসম বেগম খুবই ব্যক্তিত্ব সম্পন্না মহিলা । যে কেউ তাঁকে গিয়ে ডাকলে প্রথমে কথাটা তিনি কানেই নেন না । মন দিয়ে চায়ের কাপে চামচে দিয়ে চিনি নাড়েন অথবা ধীরে সুস্থে নাস্তা বানান । তারপর যার নাস্তা তাকে আস্তে করে ডাক দেন । ঠিক বাবার উল্টোটা । আম্মির মাও আম্মিকে ভয় খায় । সহজে ঘাঁটান না । অবশ্য আমাদের সাথে তাঁর দেখা খুব কম হয় ।
আব্বু তুমি চাদর দিয়ে আছ কেন ? শরীর খারাপ ?
বাবা স্বাভাবিক গলায় বললেন , শরীল খারাপ কেন হবে ? আমার শরীল তোদের মত না যে কথায় কথায় খারাপ করবে । চাদর দিয়েছি কারণ আমার শীত লাগে ।

আমার বাবা গলা পর্যন্ত সাদা চাদরে ঢেকে বিছানায় বসে আছেন । তাঁর সামনে সকালের খবরের কাগজ । কাগজটা তিনি এখনো পড়েননি । আগে কেউ তাঁর কাছে খবরের কাগজটা পড়বার জন্য কিছুক্ষণ অনুনয় বিনয় করবে । যথারীতি তিনি তাকে বলবেন যে আজকের কাগজ তিনি এখনো খুলে পড়েন নি । সে এখন আধ ঘন্টাটেক অপেক্ষা করুক । আধ ঘণ্টা পর বাবার কাগজ পড়া হয়ে গেলে সে খবরের কাগজটা হাতে পাবে । তার আগে না । আজ বাবার কাছে কাগজ নেবার জন্য তেমন কেউ আসে নি । আজ শুধু সোমা এসেছে । সোমা এইসব খবরে তেমন কিছু বিশ্বাস করেনা । সোমার বিশ্বাস ওখানে সব বানানো খবর লেখা থাকে । জার্নালিসিম পড়বার জন্য সোমাকে একবার অনেক গুলো খবরের কাগজের অফিসে কিছু খোঁজ খবর করতে যেতে হয়েছিল । সেখানে জানতে পারে খবরের কাগজেরও নাকি স্টোরি হয় । রিপোর্টারদের সেই স্টোরিটা নিজেদেরই বানাতে হয় । প্রত্যেক রিপোর্টারই একেকজন সার্থক গল্প লেখক । যাইহোক সোমার কথা পরে বলব , আগে বাবার বিষয়টা শেষ করি । আগেই বলেছি বাবা নাকে ঠিকমত নিঃশ্বাস পাচ্ছেন না । এজন্য প্রায়ই তাঁর দম বন্ধ লাগে । কিন্তু এজন্য তাঁর চেহারায় অসুস্থতার কোন ছাপ পড়েনি । তাঁর শরীর বেশ সুন্দর এবং টানটান । কাঁধ চওড়া এবং হাঁটবার সময় মেরুদণ্ড সোজা রেখেই হাঁটেন । বাবা যখন হাঁটেন তখন রাস্তায় আমার বন্ধুদের দুই একজন বাবাকে ভালো করে দেখার জন্য বাইক থামিয়ে দাঁড়িয়ে যায় । বাবার গায়ের রং উজ্জ্বল এবং প্যান্টের মধ্যে শার্ট তিনি গুঁজে পড়েন । দিনরাত হাঁটার মধ্যে থাকার ফলে বাবার পায়ের নীচটায় একটা যন্ত্রণা হয় । ডাক্তার এইজন্য বাবাকে ধমক দিয়েছে । বলেছে , আপনি রোজ কতক্ষণ হাঁটেন ? আধঘণ্টা না আরও বেশী ? 
খুশী মনে বাবা জবাব দিয়েছেন , রোজ দেড় ঘণ্টা । আল্লার কসম , আমি মিথ্যা কই না ।
সে কি ? দেড় ঘণ্টা হাঁটেন কীজন্য ? আপনার না অষ্টিও আর্থারাইটিস ?
আমি না হাঁটলে আমার ছোট মেয়েটাও হাঁটে না । ওকে আমি রোজ হাঁটার অভ্যাস করাই ।
আমি এখনো বাবার কাছে ছোট মেয়ে । সেইজন্য বাবা আমাকে গুনতির মধ্যে ধরেন না ।
ডাক্তার তেজী গলায় বললেন , আপনার কাছে কোনটা আগে ? আপনার মেয়ে না অস্টিও আথ্রাইটিস ?
বাবা অমনি ফোঁস করে বলে উঠলেন , কি এতবড় আস্পদ্দা ? আমার মেয়ে তুলে কথা কইবার আপনি কে ? একজন সম্মানিত ভদ্রমহিলার সম্পর্কে আপনি আজেবাজে কথা কন কি কইরা ? অ্যাই শ্যাস । এখানে আর আসুম না । সোজা হরিদ্বারই যাব । পতঞ্জলি আশ্রম ।
আমাদের বাড়িতে বাবার কথাই শেষ কথা না । তবু বাবার মতামত আমরা সবাই মন দিয়েই শুনি । আমার ছোট খালা মাঝেমাঝে বাঁকুড়া থেকে ফোন করেন । ফোনেই বাবাকে নানাভাবে বুঝান । এবারে বললেন , বড়ভাই আপনের হরিদ্বার যাওনের দরকার নাই ।বাঁকুড়ায় পতঞ্জলি যোগের আশ্রম খুলতাছে । যা হওয়ার আপনার এখানেই হইব ।
বাবা যখন খালার সঙ্গে ফোনে কথা বলছেন সন্ধ্যা সেইঘর ঝাড়ুপোঁছা করছিল । এই কাজটা আমাদের ঘরে সন্ধ্যা খুব মন দিয়ে করে । সেইজন্য সন্ধ্যার ঝাড়ু বালতি এমন কি ফিনাইলের বোতলও মা আলাদা করে দিয়েছে । সেগুলোয় আমরা কেউ হাত দিই না ।
বাবার কথা শুনে সন্ধ্যা বলল , আমি হলে কিন্তু বাঁকুড়া যেতাম না । সোজা হরিদ্বারই চলে যেতাম ।
সন্ধ্যার কথায় বাবা রেগে আগুন । তুমি কথার মাঝে কথা কইতাছো ক্যান ? পতঞ্জলি যোগপীঠের তুমি কি জান ?
সন্ধ্যাও দমবার পাত্রী নয় ।। সে বলল , আমি খুব রাগী । আমাকে খামোকা ধমকাচ্ছেন কেন ?
বেশ করেছি । কাজ করছো , মন দিয়া সেইটাই শেষ করো । আমি চাই না তুমি কথার মাঝে কথা কও । এটা বেয়াদপি ।
ধড়াম করে জল শুদ্ধ বালতি ঘরের মেঝের মাঝখানে নামিয়ে রেখে সন্ধ্যা দুপদুপিয়ে সিঁড়ির দিকে হাঁটা দিল ।
পেছন থেকে বাবা বললেন , বিদায় এখুনি বিদায় ! তোমরা এই মেয়ের পুরা বেতন দিবে না । টু পার্সেন্ট কেটে নেবে । কোম্পানীর সাথে মুখেমুখে তর্ক ।
তাই হল । সন্ধ্যাকে তক্ষুনি বিদায় করে দেওয়া হল । কিন্তু তার বদলে সেদিন থেকে জয়েন করল মালা । ঘণ্টা খানেক বাদ মালা ঘোষণা করল সন্ধ্যা ওকে আমাদের বাড়ির এবং পরিবারের নামে যা তা  বলে ওর কান ভাঙিয়ে দেবার চেষ্টা করেছে । বলেছে , এরা মানুষ না । কাজের লোককে এরা মানুষ বলেই গ্রাহ্য করে না । এবং আরো অনেক কিছু ।
প্রথমদিনে বেশি কাজ নেই মালার । হয়ে গেলে বাবা বললেন , এই মেয়েটাকে টিফিনে রোজ দুটা করে ডিম সিদ্ধ দিবে । মেয়েটার শরীর খুব দুবলা ।
আমাদের বাড়িতে সবার জন্য আলাদা আলাদা টিফিন । যে যার পছন্দমত খায় । মায়ের টিফিন কি সেইটা অবশ্য জানা নেই । কারণ আমরা যখন নাশতার টেবিলে বসে নাশতা খাই মা তখন বাগানে তাঁর শখের গাছপালার তদারক করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন । বাবা আমাকে বলে , সামরিন তোর আম্মিকেও ডাক না । বল আমাদের সাথে বসে নাশতা করতে । আজকের আলুচচ্চড়িটা মস্ত হয়েছে ।
আমি বললাম , তাই নাকি ? কিন্তু আব্বু আজ তো আলুচচ্চড়ি রান্নাই হয় নি । আজ তো সবার জন্য স্যান্ডুইচ নাশতা । গ্যাস ফুরিয়ে গেছে বলে মা তাড়াতাড়ি মাইক্রোতে করে দিয়েছে ।
তুই স্যান্ডুইচ চিনিস না ? তোকে টাকা দেব , দোকানে গিয়ে একদিন খেয়ে আসিস ।
আমি মার দিকে তাকিয়ে আছি ।তিনি সহজ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বাগান থেকে তুলে আনা শ্বেতকরবীর গুচ্ছগুলি ফুলদানীতে একেএকে সাজিয়ে রাখছেন । তাঁর চোখেমুখে বাবা বিষয়ক কোন কথাই নেই । নিশ্চিন্তে পানও চিবোচ্ছেন ।
মালা মাকে বলল , ভাবী আমি ডিমসিদ্ধ খাই না । গন্ধ লাগে ।আপনি আমাকে মাসে তিন কেজি মুড়ি দিয়ে দেবেন । ওইটাই আমার টিফিন । অন্য বাড়িগুলোতেও তাই নিই । 
ইন্ডিয়ায় কাজের লোকের বাজার খুব টাইট । এখানে জ্বাল নোটও মিলে । মাঝেমাঝে টিভিতে খবর হয় । কিন্তু কাজ করবার লোক চাইলেও মিলবে না । সবাই সরাসরি মানি মার্কেটে এজেন্সির কাজে চলে যায় নয়ত পার্টিতে ।  তারপর যারযার নিজের কপাল ।
মা বললেন , সামরিন আজ কি সোমা আসবে ? যদি আসে একটু বসতে বলবি তো ! বাবুয়ার জন্য কাল একটা জামা কিনেছি ।
বাবুয়া সোমার মেয়ে । ছোট । ক্লাশ টুয়ে পড়ে । মা প্রায়ই তাকে এটা সেটা উপহার দেয় ।
বাবা এক চুমুকে তাঁর চা শেষ করলেন । তাঁর চা কাপেই ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল । চা শেষ করে আমাকে বললেন , কয়েকটা দিন অপেক্ষা কর । আমার এফ ডি টা ম্যাচিওর হবার টাইম হয়ে গেছে । 
তোমার টাকা পয়সা এখন কিচ্ছু লাগবে না আব্বু । লাগে যদি তখন বলব , তার আগে না ।
এইখানে একটা কথা আছে । আমার বাবা চান আমি যে কোন একটা ব্যবসা করি । যা হোক কিছু । এজন্য বাবা আমার ট্রেড লাইসেন্সও করিয়ে দিয়েছেন । কিন্তু আমার লক্ষ্য অন্য । জয়পুরে যে কোম্পানীতে আমি লাস্ট দেড় বছর চাকরি করেছি সেখান থেকে কিছু টাকা পয়সা আমার জমেছে । ইদানীং আরো ভালো কোম্পানির জন্য আমি দুবেলা হন্যে হয়ে নেট সার্চ করছি । একটা কোম্পানী মোটামুটি পছন্দও হয়েছে । শুধু ফাইনাল সিলেকশন বাকী ।
আমার দিকে তাকিয়ে বাবা বললেন , ব্যবসার সবথিক্যা বড় সমস্যা কি বলতো ?
কি ? 
কেপিটেলের । যে কোন ব্যবসায় মিনিমাম দশ থেকে বারো লাখ কেপিটাল লাগে ।
আব্বু ব্যবসা করবার মত অত বুদ্ধি আমার নাই । আমার হাতে ক্যাপিটাল নষ্ট হয়ে যাবে ।
নষ্ট কেন হবে ? তুই মনে করবি এইটা তুই আমার থিক্যা ধার নিচ্ছিস । তিন মাসের ভেতরে আবার রিটার্ণ । মানে আমি হলাম গিয়ে তোর ব্যবসার স্লিপিং পার্টনার । বুঝলি ?
আব্বু আমি চাকরী বুঝি । প্রোগ্রামিং বুঝি । ব্যবসার কত খানা খন্দ রয়েছে সেসবের কিছুই জানি না । ওসব আমার কম্ম না । তবে তুমি যখন বলছ , সোমাকে একবার বলে দেখতে পারি । ওর শিগ্গিরি একটা কাজ খুব দরকার ।
বাবা চা শেষ করে উদাস মুখে টেবিলে নখ দিয়ে আঁচড় কাটেন । তখন তাঁকে আমার খুব মায়া হয় ।অবশ্য এরকম হওয়ার তেমন কোন কারণ নেই । বাবা কারুর কাছ থেকেই নিজের প্রকৃতি লুকাতে পারেন না । আর এজন্য বাবাকে কেউ তেমন পছন্দও করেনা । ভাবতে ভাবতে আমার চোখ হঠাৎ কড়কড় করতে শুরু করে । জল আসার আগে যেমন হয় ।
আমার বাবা আবদুল্লা ঘানি খোন্দকার বোকা মানুষ না চতুর তা আমি কখনও ধরতে পারিনি । তাঁর কথাবার্তা বা বাহ্যিক ব্যবহার খুবই ইঙ্গিতপূর্ণ । যে কেউই মটিভেট হবে । কিন্তু বোকদের কথা কেউ গ্রাহ্য করেনা । সুতরাং এদিক দিয়ে বলতে গেলে তিনি বোকা নন । বাবার সমস্ত কাজের পেছনেই একটা বড় আদর্শ থাকে । বাইরের লোকজনেরা এজন্য বাবাকে আবদুল্লা সাহেব বলে না , বলে দিবানগী ।
আজ জুম্মাবার । সকাল দশটা মাত্র । আমি বাবার ঘর থেকে বসার ঘরে সোমার কাছে ফিরে এলাম । বাবার এখন শীত করছে না । তাই সাদা চাদরটা তিনি খুলে বাঁপাশে জড়ো করে রেখেছেন । তাঁর ফরমাশ এখনও পালন করা হয়নি । তাতে অবশ্য কোন সমস্যা নেই । কারণ বাবার মধ্যে কোন তাড়াহুড়া নেই । মা যদি তাঁর কাছে দুঘন্টা পরও যান  বা এবেলার মধ্যে নাও যান তিনি মাকে বা আমাকে আর ডাকবেন না ।
সোমা বলল , সামরিন অনুরাধার খবর কি রে ? ফোন করেছিল ?
কই না ! 
অনুরাধা সবাইকে বলে বেড়চ্ছে ও নাকি আর দু মাস পর ইউ এস এ চলে যাচ্ছে ।
তোর কি মাথা খারাপ হয়ে গেল ? অনুরাধা অত টাকা কোথায় পাবে ?
আরে ন্না ! অনুরাধার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে না ?
তুই কি করে জানলি ?  তোকে ফোন করেছিল ?
না । সবাই জানে , সেখান থেকে আমিও জেনেছি । বুঝলি সামরিন , মেয়েটার কপাল আছে বলতে হবে ।
সোমা লজেন্স খাবি ? আমার কাছে আছে ।
আমি প্যাকেট খুলে একটা লজেন্স নিজে নিলাম , আর একটা সোমাকে দিলাম 
। লজেন্সটা মুখে পুরে সোমা কড়মড় শব্দ করে সাথে সাথে ভেঙে ফেলল । সোমার মুখ দেখে মনে হল না এই শব্দটা ওর কানে গেছে । অনুরাধা সোমার পিঠোপিঠি বোন । বাবুয়াকে নিয়ে সোমা বস্তিন বাজারে একটা ঘর ভাড়া করে একলাই থাকে ।অরুনাভর সঙ্গে পাকাপকি ডিভোর্স না হওয়া অব্দি সোমা ওই রকমই থাকবে । হাই তুলতে তুলতে সোমা বলল , there are many things in heaven and earth .  কার কথা কথা বলতো ? শেক্সপীয়র ।
শেক্সপীয়রের কথা বললেও সোমা কিন্তু শেক্সপীয়র পড়ে না । অথচ নানা রকম কথাবার্তার ফাঁকে এইরকম কোটেশন ও প্রায়ই গুঁজে দেয় । সমস্যা হচ্ছে সেইসব ডায়ালগে ওকে তখন খুব মানিয়েও যায় । মনে হয় ও নিশ্চই আগে থেকে সিচুয়েশনটা জানত ।
সোমা বলল , সামরিন কাল রাত্রে রাগে দুঃখে আমি অনেকক্ষণ কেঁদেছি । অনুরাধা যদি শেষ পর্যন্ত অরুনাভকেই বিয়ে করে তাতে আমার বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই । কিন্তু আমি জানি এই বিয়েটা শেষ পর্যন্ত হবে না । বরং যা হবে আমার ডিভোর্সটা মাঝখান থেকে ঝুলে যাবে ।
সোমার চোখের নীচে ঘন কালি আর ফোলা ভাব । চেহারাটাও আর আগের মত নেই , কেমন থ্যাসথ্যাসে । এ বাদ দিলে সোমা দেখতে খারাপ না ।বাবুয়ার পড়ার খরচ নিজেই চালাচ্ছে । সবদিক একা দেখতে হচ্ছে বলে সোমার চেহারায় একটা দায়ীত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বের ছাপ পড়ে গেছে । আমার ধারণা সোমার ক্যারেক্টারে ভবিষ্যতে আরো অনেক রকম টার্ণ আসবে । 
সোমাকে বল্লাম , দুপুরে মাংস খাবি ? তাহলে রিয়াজে যাই চল্ । বাসায় আজ নিরামিষ রান্না ।
কেন আজ কি আছে ?
কিচ্ছু না । আজ ভাইয়ার দিমাগ চড়ে গেছে । সকাল থেকে ঘরের বাইরে আসেন নি ।
ভাবীর সাথে ঝগড়া হয়েছে ?
হয়েছে হয়ত । আমরা ওসব বুঝব না , রিয়াজ যাবি কি না বল্ ।
সোমা বল্ল , আচ্ছা যাব তাহলে । যাহার পা দুটা আছে , সেই ভ্রমন করিতে পারে । কিন্তু হাত দুটা থাকিলেই তো আর লেখা যায় না ? বল তো কার লেখা ?

আমি রান্নাঘরে ঢুকে মাকে বললাম, আব্বু তোমাকে ডাক দিয়েছে । এখনই যাও । মা কিছু বলল না। রান্নাঘরে মার পাশে ভাবী দাঁড়িয়েছিল ।পিছন ফিরে রুটিতে মাখন লাগাচ্ছে । এরপর হয়ত ছুরি দিয়ে আপেল শসা কাটবে । ভাইয়া দেরী করে নাশতা খায় ।
মা বলল , সামরিন তোর বাবার সঙ্গে তোর তো খুব ভাব । তোর বাবাকে একটা কথা বুঝায়ে বলতে পারবি ?
জি আম্মি ।
বলবি যে ডাক্তার যে ওষুধগুলা তোমারে খাইতে দিছে সেইগুলায় এখনো হাত পড়ে নাই কেন ?
কিন্তু বাবা রোজ নিয়মের ওষুধ খান তো আম্মি , আমি দেখেছি ।
ঐ ওষুধ না । এটা অন্য একটা । ঐটা খেলে তোর আব্বু ভাল থাকে , নইলে সারাদিন বকবক ।
এখন যাব আম্মি ?
মা বলল, না , আর একটু পর । আমার মাথা ধরেছে । আগে সেইটা কমুক ।

আমাদের বাসার তিনতলার সবচেয়ে উপরের বড় ঘরটা ভাইয়ার । ভাবীর সঙ্গে বিয়ের পর থেকে ভাইয়া ঐ বড় ঘরেই থাকছেন । ঘরটায় অনেক জানলা আর সিলিংএ দুইটা ফ্যান । এসিও থাকে । এই ঘর ভাবী নিজের হাতে গুছায় । মা নিয়ম করে দিয়েছে । অন্য আর কেউ এখানে ঢুকবে না । এমন কি ঝাড়ু পোঁছার জন্য মালাও না । ভাবী যতক্ষণ ঘর পরিষ্কার করে ভাইয়াও ঘরের ভেতরেই থাকে । তখন দরজা জানলা সবই ভেতর থেকে বন্ধ থাকে । ঘটনাটা আমি জানি আর মা । আজ ভাবী তিনতলার ঘর ঝাড়ু পোঁছা করতে যাচ্ছে না । পরে যাবে হয়ত । ভাইয়ার নাশতার প্লেটটা আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে মা বলল , ঐ কাপটার নীচে দেখ চারশো টাকা চাপা দিয়ে রাখা আছে । গিয়ে মুন্নুকে দে , বলবি আজ সন্ধ্যার সময় পরভিনকে নিয়ে আমি ডাক্তারের কাছে যাব , চেংড়া ডাক্তার না , লেডী গাইনোকোলজিস্ট ।
মায়ের কথায় আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম । ভাবী মুখ নীচু করে আছে । আমার মুখের দিকে তাকিয়ে মা গম্ভীর হয়ে বললেন , আল্লাহপাকের কয়টা নিয়ম আছে জানিস ? নিরানব্বইটা ।
আমি বুঝদারের মত মাথা নাড়িয়ে নাশতা ভরা প্লেট নিয়ে তিনতলায় ভাইয়ার ঘরে গেলাম । বুঝলাম মা এবার নতুন নিয়ম করে দিয়েছেন , নাশতার প্লেট ভাবী আর নিয়ে যাবে না ।
আমার ভাইয়ার নাম ফারহাদ ইফতিকার । লালচে সোনালী চুল আর চোখের মনি হালকা নীল । কিন্তু ভাইয়ার গায়ের রং আমাদের কারুর মত না । আমাদের বাসায় একমাত্র ভাইয়ার গায়ের রংই দুধে আলতায় । আমি চারশো টাকা ভাইয়ার সামনে বিছানায় নামিয়ে রাখলাম ।
ভাইয়া বলল , সামনের চেয়ারটায় বোস্ ।
বিছানায় অনেক রকমের বই ছড়ানো । ভাইয়া এখন কেমিস্ট্রীর ওপরে পোস্ট ডক্টরেট করছে । জিনিষটা ঠিক কি এর বেশী আমি জানিনা । এস এস সি পরীক্ষায় সব ছেলেমেয়ের মধ্যে আমার ভাইয়া থার্ড হয়েছিল । এখন উড়াউড়া শোনা যাচ্ছে থিসিস শেষ হবার আগেই নাকি ভাইয়া ইউনিভার্সিটি জয়েন করবে । ভাইস প্রিন্সিপালের পদ ।
ভাইয়া বলল , তোর খবর কি বল্ ?
আমি হুট করে বলে ফেললাম , সোমার জন্য একটা ছোটখাটো চাকরীর ব্যবস্থা করে দিতে পারবে ? তোমার তো অনেক জানাশোনা । 
সামরিন তোকে একটা কথা বলার ছিল ।
জি ভাইয়া !
বাবা নাকি আজকাল নাকে নিঃশ্বাস নিতে পাচ্ছেন না ? তুই বিশ্বাস করিস ?
হ্যাঁ করি ।
ভাইয়া কঠিন গলায় বলল , বাবার মাথা খারাপ হয়ে গেছে । এই সাইক্রিয়াটিস্ট বাবাকে ঠিক করতে পারবে না । ডাক্তার পাল্টাতে হবে ।
আমি চুপ করে আছি । কোন কথাই বের হচ্ছে না ।
এরপর কুড়ি সেকেন্ড ভাইয়া কোন কথা বলল না । কুড়ি সেকেন্ড পর উপুর থেকে সোজা হয়ে  ভাইয়া বিছানায় উঠে বসল । বসে ধীরে ধীরে বলল , অনেকগুলো কারণে বাবার চিকিৎসা করাতে হবে । প্রথম কারন , বাবা মা ছেলেমেয়ের আদর্শ । বাবা মারা যদি হঠাৎ কোন কারণে অসংগত আচরণ করতে শুরু করে তাহলে ছেলেমেয়ের মনে দারুণ আঘাত সৃষ্টি হতে পারে । এই আঘাত কোনভাবেই কাম্য নয় । দ্বিতীয় কারণ ,এইরকম অসংগত আচরণে পাড়া প্রতিবেশীরা বিরক্ত হতে পারে যার কোন জলদি সমাধান হয় না । তৃতীয় কারণ , বাবার এখন যা বয়স তাতে বাবাকে একজন কারু মুরিদ হতে লাগবে । যিনি বাবাকে ফানাফিল্লাহ শেখাবেন । সাধনার শেষ স্তর । আল্লাহপাকের সঙ্গে ডাইরেক্ট কানেকশন্ । চতুর্থ কারণ ......
ভাইয়া এমন ভাবে বলে যাচ্ছে যেন পরীক্ষায় প্রশ্ন এসেছে , তার উত্তর দিয়ে যাচ্ছে পরপর গুছিয়ে । ঠিকমত না লিখতে পারলে নাম্বার কাটা । পরীক্ষায় যে প্রশ্ন এশছে , তা এইরকম – তোমার বাবা কিছুদিন হল হঠাৎ অসংগত আচরণ করছে । এর পেছনে তোমার যুক্তিগুলি উদাহরণ সহ ব্যাখা কর ।
সামরিন !
জি !
বাবার ব্যাপারটা সবসময় মাথায় রাখবি । তোর স্বভাব হচ্ছে তুই যখন যার সঙ্গে থাকিস তার ছায়া হয়ে যাস ।
জি !
এখন যা । আর যাবার সময় বাইরে থেকে দরজাটা টেনে দিয়ে যা ।
বলতে বলতে ভাইয়া নিজের মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল । বোধহয় কারু কল টল আসছে । আমি ঘরের বাইরে বেরিয়ে এলাম , শুনতে পেলাম ঐ অবস্থাতেই ভাইয়া হাল্কা উঁচু গলায় আমাকে বলল , তোর বন্ধু সোমাকে একহপ্তা পর আমার সঙ্গে দেখা করতে বলিস । 


রিয়াজে আমি আর সোমা হলঘরটার একদম মাঝখানের টেবিলে বসলাম । টেবিলের সামনে বল ভর্তি পানি , পানিতে ছোট লিলি ভাসছে । আমরা আসার আগে বোধহয় এইখানটায় কোন ফ্রেশনার ট্রেশনার স্প্রে করা হয়েছিল ।
সোমাকে বললাম , ভাইয়া তোকে একসপ্তা পর দেখা করতে বলেছে ।
সোমা কোন উত্তর দিল না । আমি আবার বললাম , সোমা আগে স্যূপ খাবি ? তালে দুটো ভেজিটেবিল স্যূপের অর্ডার দেই ।
সামরিন একজন আমাকে একটা কাজের অফার দিয়েছে । কাজটা নোবো কি না তাই ভাবছি ।
কিসের কাজ ?
সোমা চাপা গলায় বলল , একটা প্রোডাকশনের । কিছু অ্যাড ফিল্ম তৈরী হবে । সেখানে কস্টিউম হিসাব রাখার কাজ । কিন্তু কাজটা আমার ঠিক লাগছে না ।
তুই বুঝলি কিকরে ?
বুঝলাম । যাদের কস্টিউম হিসেবে রাখতে হবে তাদের সঙ্গে বাই ফোনে কথা বলে কাজটা করতে হবে , নো ডাইরেক্ট ভিজিট ।
তাতে তোর কি ? টাকা কত দেবে বলেছে ?
টাকার কথা না । আসল কথা এই প্রোডাকশন বাজে ছবি তৈরী করে , করে বাজারে ছাড়ে । আমি ওর মধ্যে নেই ।
আমি নীচু স্বরে বললাম , তালে তো ঝামেলা চুকেই গেল ।
গম্ভীর হয়ে সোমা বলল , না ঝামেলা এবার শুরু হল । যেদিন কথা বলতে যাই সেদিন লোকানো ক্যামেরায় আমার ছবি তোলা হয় । আমাকে সবাই চিনবে কিন্তু আমার সঙ্গের পুরুষমানুষটাকে কেউ চিনবে না । এই ছবিও ওরা বাজারে ছাড়তে পারে । ভাল বিজ্ঞাপন হবে , নীচে কিছু ক্যাপশন থাকবে অবশ্যই । 
সোমা চামচ দিয়ে স্যূপ খাচ্ছে । সোমার চোখের জল গড়িয়ে গড়িয়ে স্যূপের বাটিতে মিশে যাচ্ছে ।।বদনাম ছড়িয়ে গেলে সোমা কোন ভাল জায়গায় কাজ পাবে না । আমি সাহস করে বলে ফেললাম লোকানো ছবিটা তুই কি দেখেছিস ?
অনুরাধা দেখেছে , দেখে আমার অ্যাকাউন্টে মেল করে দিয়েছে ।
আমি  ‘ ও আচ্ছা ’ বলে চুপ করে গেলাম । রিয়াজ এর বিরয়ানির নাম ডাক আছে । অন্য রেস্টুরেন্টের মত এরা যা তা চাল দিয়ে বিরানি বানায় না । বড় হলুদ প্লেটে স্যালাডের সাথে মাংস ভাত ডিম সাজিয়ে দিয়েছে । দেখতে দারুণ লাগছে । সোমাকে বললাম , তোর কি ধারণা এর মধ্যে পুরো ব্যাপারটা জানাজানি হয়ে গেছে ?
ফোঁপাতে ফোঁপাতে সোমা বলল , বাড়িতে জানাজানি হলে আমি নির্ঘাৎ আত্মহত্যা করে মরব । বাবুয়াকে তখন তুই দেখিস ।
খুবই আশ্চর্যের কথা সোমা এখন কোন বিখ্যাত ডায়ালগ মুখস্থ বলছে না । সোমাদের বাড়ির ছাদ বর্ষাকালে শ্যাওলা পড়ে ভয়ানক পিছল হয়ে থাকে । ছাদের একদিকের কার্ণিশ আবার নেই । এইরকম পিচ্ছিল ছাদের কিনারায় যে কেউ গিয়ে দাঁড়ালে সমূহ বিপদের সম্ভাবনা । এইসব হিসাব নিকাশ আমার ভাইয়া বলতে পারে । সংখ্যাতত্ব পামিস্ট্রী নিউমারোলজী ইত্যাদি নিয়ে ভাইয়ার অনেক রকম পড়াশোনা আছে । আমার মত ওপর ভাসা বিদ্যা না ।

বাসায় ফিরলাম সন্ধ্যা পার করে । সোমাকে ওর এক পুরোন বন্ধু নিউ স্যুইট হোম পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে এলাম । গলিটা দিনের আলোতেও শুনশান থাকে । তারপর অটো ধরে সোজা বাড়ি । এসেই দেখি বাসায় হুলুস্থুল কান্ড । বাড়ির সামনে পাড়া প্রতিবেশীদের ভিড় । ভেতরে সব লাইট জ্বলছে । বারান্দায় মা আর ভাইয়া হাঁটাহাঁটি করছে ।
কই ছিলি এত রাত পর্যন্ত ? এদিকে মোবাইলে রিং হয় অথচ মোবাইল ধরিস না ?
কই রিং তো হয়নি ?
বাবাকে পাওয়া যাচ্ছে না জানিস ? মিসিং !
সেকি ? কখন থিক্যা ?
অস্থির পায়চারী থামিয়ে ভাইয়া কোনক্রমে বলল , বিকেলে আমাকে বলল , নাকে নিঃশ্বাস পাচ্ছে না । দম বন্ধ হয়ে আসছে । শুনে বললাম , যাও একটু বার থিক্যা ঘুইর‍্যা আসো । তোমার নাক না মাথা খারাপ হইছে । উঃ কেন যে কথাখানা বললাম ।
ভাইয়া ডানহাত দিয়ে বাঁহাতের তেলোর ওপর জোরসে ঘুঁষি মারলেন ।
আমি মার দিকে তাকালাম । তাঁর চেহারায় শান্তি শান্তি ভাব ।
বললেন , গেছে যখন ঠিক ফিইর‍্যা আসব । পায়ের যন্ত্রনা আছে না ?
আমাদের প্রতিবেশী মাহফুজ ভাই বললেন , দিনকাল ভাল না ভাবী । তার উপর রাস্তাঘাটের যা হাল ।
ঘরের মধ্যে থেকে ভাবী আমাকে ঈশারায় ডাক দিলেন । 
চা খাবে ? জল বসিয়েছি । এই নিয়ে তিন তিন বার ,
তুমি কোথাও গিয়েছিলে ভাবী ?
এই কথায় ভাবীর মুখটা একটু লজ্জা লজ্জা হল । আমাকে পলকে একটু দেখেই মুহুর্তে আবার চোখ নীচে নামিয়ে নিলেন ।
সামরিন ! 
জি ! 
আব্বুর কিছু হয় নাই তো ? আমার খুব ভয় করছে । ফি আমানিল্লাহ্ ।


সেদিন অনেক রাত্রে আমার বাবা বাড়ী ফিরলেন । পেছনে বিরাট এক মিছিল । পথে ঘাটে বাবা যাকেই দেখতে পেয়েছেন সকলকেই বলেছেন , মিলমিশ করে একসঙ্গে থাকার মধ্যে যে আনন্দ তা আর কোথাও নাই । বলা বাহুল্য বাবার এই পরিকল্পনায় সকলেই সায় দিয়েছে । তারপর তারাই বাবাকে বাড়ী পৌঁছে দেবার জন্য উদ্যোগ নিয়েছে । সুখের কথা বাবা কাউকেই মুখের ওপর না বলতে পারেন নি । রাত দশটায় বাড়ী ফিরে বাবা মাকে বললেন , ভাল কইর‍্যা চিন্তা কইর‍্যা চিন্তা কর বেগম । মানুষের জন্য আল্লাহ্তালাহ্ কতই না সুবন্দোবস্ত কইর‍্যা দিছে । থাকার জন্য ঘর দিইছে , পেটের জন্য ভাত , পরণের কাপড় চোপড় । অথচ মানুষ এমন বুরবাক যে ইশারা বুঝেনা । কেবলই বেশুমার কথা কয় । কেবলই বকওয়াশ্ ।
বলা বাহুল্য মা বাবার কোন কথারই উত্তর দিলেন না । আমাকে বললেন , কাল সন্ধ্যায় মাগরীবের নামাজের পরে মিলাদের ব্যবস্থা করতে হবে । যে মওলানা মিলাদ পড়াবেন তাঁকে যেন আমি গাড়ী করে আনতে যাই ।
তাই করলাম । পরদিন সন্ধ্যার সময় মওলানা এলেন । কাউকে না পেয়ে শেষে আমাকেই প্রশ্ন করে বসলেন , মিলাদ যে পড়াবো আর লোকজন কই ? কেউ আসবে না ?
জি আম্মি আসবে এখুনি ।
সেকি ? মাত্র দুইজন ?
জি । আমার বড়ভাই বাসায় নাই । উনি কোথাও বাইরইছেন । আর আমার আব্বু ঘর থিক্যা বার হন না । আপনি শুরু করে দিন । 


কুড়ি তারিখ সন্ধ্যায় একটা চাইনীজ রেস্টুরেন্টে আমরা সোমার মেয়ে বাবুয়ার জন্মদিন পালন করলাম । সোমার কাছে পনেরশো টাকা ছিল সবটাই জন্মদিনের পেছনে খরচ করেছে । 
সামরিন্ !
বল্ শুনছি ।

সোমার গলা ভাঙা । মুখচোখ লাল । গত দুইরাত বোধহয় ভাল করে ঘুমোয় নি । খাওয়া দাওয়া করেছে কিনা তাও বোঝা যাচ্ছে না ।
সিগারেট খাবি ?
না ।
না খাস তো বাবুয়াকে নিয়ে একটু বাইরে যা ।
তোর কাছে সিগারেট আছে ?
সোমা বলল , নেই , কিন্তু বললে এখুনি দিয়ে যাবে । আমি তো আর স্মোকার নই যে আমার ব্র্যান্ড লাগবে । আর একটা কথা , বাবুয়া আজ রাত্রে তোর কাছে থাকবে ।

আমি বাবুয়ার হাতে ছোট ব্যাগটা ধরিয়ে দিয়ে বললাম , বাবুয়া ডিজনীল্যান্ড যাই চল্ ।
মা যাবে না ?
নাঃ শুধু তুই আর আমি । দুজন ।
বাবুয়া হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ল । আজ সে দারুণ খুশী । অনেক ছবির বই আর খেলনা উপহার পেয়েছে ।
বাবুয়া হেঁটে যেতে পারবি তো ?
পারব ।
সোমাকে ভেতরে রেখে আমরা রেস্টুরেন্টের বাইরে এলাম । ডিজনী ল্যান্ডের গেটটা এখান থেকে দেখা যাচ্ছে । বেশি দূর না । 
বাবুয়া আজ রাত্রে আমার কাছে থাকবি ? একসঙ্গে ঘুমাবো ।
হ্যাঁ থাকব ।
তোর মায়ের জন্য মন খারাপ করবে না ?
না তো !  রাত্রে তো আমি রোজ একাই ঘুমোই । পরশু মা কাঁদছিল আর কাকে ফোনে কথা বলছিল । আমি মাকে কত ডাকলাম , মা মা । মা শুনলই না । বলল , যা ওঘরে গিয়ে খেল ।
রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বাবুয়া আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে ।
আচ্ছা এবার বল্ , তুই পুরো কেকটা খেলি না কেন ? তোর জন্য তোর মা অতবড় কেকের অর্ডার দিল ।
আজ আমার শরীর খারাপ । কপালে হাত দিয়ে দেখ আমার জ্বর ।
আমি নীচু হয়ে বাবুয়ার কপালে হাত দিলাম । মেয়েটার গা সত্যিই গরম ।
বাবুয়া কোলে উঠবি ।
সে প্রশ্নের জবাব দিল না । আমার দিকে ফিরেও তাকাল না । তার ভূবনে এখন কি আছে সে বলতে চায় না । এ একদিন বড় হবে । বিয়ে হবে । তখন তারও মেয়ে হবে । সেই মেয়েরও জন্মদিন হবে । জন্মদিনে মা মেয়েকে বলবে আমি যখন  তোর মত ছোট ছিলাম জন্মদিনে আমার জ্বর হয়েছিল । সবাই যখন ভাবছিল জন্মদিন বলে আমি খুব খুশী , আসলে তখন আমি শীতে কাঁপছিলাম ।
বাবুয়ার চোখ টকটকে লাল । ডিজনী ল্যান্ড ছেড়ে ওকে নিয়ে আমি সোজা ডাক্তারের কাছেই গেলাম । সেখানে বলল , কি ভাইরাস বোঝা যাচ্ছে না । ডেঙ্গু হতে পারে । ব্লাড রিপোর্টটা দেখি কি হয় ?
সেইদিন রাত্রে আমি স্বপ্ন দেখলাম একটা জায়গায় আমি বসে আছি আর কয়েকজন মিলে আমার মাথায় পানি ঢালছে । একেবারে বরফের মত ঠান্ডা পানি । আমি না পারছি কাউকে ডাকতে না পারছি উঠে যেতে ।।সোমা বলছে , সামরিন চুপ করে একজায়গায় বসে থাক । নয়ত জল ঢালতে অসুবিধা হচ্ছে । আমি সোমার দিকে তাকালাম , দেখলাম সোমার পরণে একটাও পোষাক নেই । সব একটান মেরে খুলে ফেলেছে ।
 আজ বারো ঘন্টার হরতাল । রাস্তা ঘাট একদম ফাঁকা । তবে ছেলে মেয়েরা ফুটবল ক্রিকেট খেলছে । আমি ভাবীকে নিয়ে গাইনোকলজিস্টের চেম্বারে যাচ্ছি । এই ডাক্তার হরতাল মানান না । ভাবীর মুখচোখ উদ্বিগ্ন । শাড়ির আঁচলটা গায়ের সঙ্গে সাঁটিয়ে ধরে রেখেছেন । মা এখন যাযা বলবে ভাবীকে তার সবই শুনে যেতে হবে । এই যে আমরা দুজন এখন হেঁটে হেঁটে ডাক্তারের চেম্বারে যাচ্ছি এটাও মায়ের আদেশ । গাড়ি চাপা চলবে না । এক্সেসাইজ । কোন ভাবেই ভাবীর যেন ফ্যাট না হয় । ফলে যখনই পাশ দিয়ে খালি রিক্সা চলে যাচ্ছে , ভাবী অসহায়ের মত সেই রিক্সার দিকে তাকাচ্ছে । কিছু করার নেই । কারণ আমাদের কাছে ডাক্তারের ভিজিটের টাকা ছাড়া অন্য টাকা নেই । মা আনতে দেয় নি ।
চেম্বারে পৌঁছে ভাবীই আগে ভেতরে ঢুকে গেল । পেছনে বাধ্য মেয়ের মত আমি । কাউন্টারে একটা ফর্সামত মেয়ে বসে । মেয়েটার মাথার ঠিক ওপরের দেওয়ালে এক বিরাট ছবি সাঁটা । ছবির ভেতরে অনেক গুলি খোপ । প্রথম খোপ দুটায় কিছুই বুঝা যায় না । তিন নম্বর খোপে একটা মুরগী বাচ্ছা পা উলটে শোয়ানো । পেটটা বেঢপ । শেষে ছবিতে সেই বাচ্ছাই ক্রমে আকৃতি বদল করে মানুষ । পা গুলো কাঠি কাঠি । বন্ধ চোখের পাতা । দেখলেই বুঝা যায় এই মাংস বেশ টাটকা । টেবিলের বাঁ পাশে দেওয়াল ঘেঁষে একটা ঢাউস টিভি  । হিন্দি সিনেমা চলছে সেখানে । ঘরশুদ্ধ সবাই সেইদিকেই তাকিয়ে । ভিলেন নায়িকার শাড়ী খুলে দিয়েছে । নায়ক এখনো এসে উপস্থিত হয়নি । ব্যাক গ্রাউন্ডে দুর্দান্ত একটা মিউজিক দিয়েছে । এইসব সীনে খুব একটা ডায়ালগ থাকে না । ডায়ালগ থাকলে সিকোয়েন্স পড়ে যায় । ভিলেন ও নায়িকা দুই জনেই গলগল করে ঘামছে । নায়িকার আবার চুলও খুলে গেছে । ফলে খোলা চুলে তাকে আরও সুন্দর দেখাচ্ছে । এই নায়িকা সোমার পছন্দের । এর দেখে সোমা পোষাক নকল করে । নায়িকাকে দেখে আমার গত রাতের স্বপ্নটা মনে পড়ে গেল , এর সঙ্গে সোমার অনেক মিল । কিন্তু  বন্ধু বান্ধবের ধর্ষণ হওয়া দেখতে ভাল লাগে না  ।নায়িকারটা ভাল লাগে । কারণ সিনেমায় শেষ মুহুর্তে মানে ভিলেন ঝাঁপ দেবার আগে নায়ক এসে হাজির হয়ে যায় । তখন কয়েক প্রস্থ ঢিসুম ঢিসুম । মারামারির দৃশ্য । এবং এরপরই জমাটি নাচ ।
কিন্তু এই সিনেমায় সেইটা দেখাল না । শাড়ী খোলা নায়িকা ব্লাউজের ভেতর থেকে মোবাইল বের করে পাওয়ার বটন প্রেশ করে দিল । ব্যস কেল্লা ফতে । কিছুক্ষণের মধ্যেই পুলিশ টুলিশ হাজির । ভিলেনের চোখে বিস্ময় । বলছে , আমার কোন দোষ নাই । ওনার কাপড়ে বিছা ঢুকে গেছিল ।
পুলিশ বলল , সেটা পরে দেখা যাবে । আগে টিপে তোর রস বার করি । এই তোমরা এর প্যান্ট খুলে ফেল ।
পুলিশের সঙ্গে একজন ডাক্তারও আছে । ডাক্তার ভিলেন কে জানাল , কিছু মনে করবেন না । সমাজের স্বার্থেই এটা করা হচ্ছে । আমি আপনাকে লোকাল অ্যানাস্থেসিয়া করে দেব ।

চৈত্র মাসের এগারো তারিখ বাবা বসার ঘরে জানালায় দড়ি বেঁধে সুইসাইড করলেন । বাংলা মাসের নাম এজন্য বললাম এক চৈত্রে এ গল্প শুরু করেছিলাম , এখন আর এক চৈত্র । গাছগুলিতে নূতন পাতা । রোদ সেই সোনালী হলুদ । ইস্কুলের ছেলে মেয়েরা যে যার নতুন ক্লাশে উঠেছে । তাদের হাতে রঙীন ফুলের গুচ্ছ , নতুন ক্লাশ টীচারকে দেবে । এগারো তারিখ সন্ধ্যার আকাশ খুব পরিষ্কার ছিল । সুইসাইড করবার জন্য বাবা এই দিনটাই বেছে নিলেন । সিলিং ফ্যান এ বাবার অ্যালার্জী তাই জানলার রডই ব্যবহার করলেন । আমরা সবাই ধরাধরি করে গলার ফাঁস খুলে বাবাকে বিছানায় এনে শুইয়ে দিলাম । বাবার হাত পা তখনও গরম । ভাইয়া দৌড়ে গিয়ে অ্যাম্বুলেন্স কল করল । মেডিকেলে নিয়ে যাওয়া হবে । ভাইয়ার দুটা হাতই কাঁপছে ।
মা বললেন , পুরা বাড়িটাই এসি করে দিব , সিলিং এ ফ্যান থাকব না আর !
ভাইয়া মা কে এক ধমক দিয়ে বলল , আম্মি চুপ করে থাকো ।

বাবা কপালে অদৃশ্য ঈজমে আজম নিয়ে শুয়ে আছেন । ভাব ভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে ব্যাপারটা তিনি বেশ উপোভোগ করছেন । কারণ এত শব্দেও তিনি চোখ খুলছেন না । জানলার গ্রীলে বাবার গলায় বাঁধার দড়ি তখনো ঝুলছে । বাতাসে কাঁপছে মাঝে মধ্যে । আমি বাবার পাশেই বসে আছি । বিছানায় তিনি চিৎ হয়ে শুয়ে আছেন । কিছুদিন হল বাবা একটা নতুন ওষুধ খাওয়া শুরু করেছিলেন । ভাবী বোধহয় কাঁদছে । কারণ কান্না শুনা যায় । ভাবী তুমি কান্দো ক্যান ? তোমার না এখন খুশ থাকনের কথা !
প্রতিবেশী মাহফুজ ভাই দরজায় এসে উঁকি দিলেন । তাঁর চোখ মুখ ভয়ার্ত । বললেন , আমাদের হাতে সময় কম । একটু তাড়াতাড়ি করতে হবে ।
জি মাহফুজ ভাই !
মাহফুজ ভাই মা কে বললেন , ভাবী আসেন আপনাকে কিছু কথা শিখায়ে দেই । নইলে উত্তেজনার সৃষ্টি হবে ।
মা বললেন , এরপর আমার আর মানসিক উত্তেজনা হবে না । বরং যা হবে , তা হল রাগ । 
রাগের সময় মানুষ ভুল করে বেশী ।
আমি ভুল করব না ।
আপা মাথা গরম কইরেন না । এখনই পুলিশ আসব , হ্যান ত্যান একগাদা প্রশ্ন করবে ।
মা কাঁদো কাঁদো হয়ে বললেন , তোর বাপ আমাকে সারা জীবন জ্বালালো ।
আমার ধারণা মা এই প্রথম তাঁর স্বামীর অত্যাচারের বিরুদ্ধে কান্নাকাটি করলেন । আমি বাবার পাশ থেকে উঠে গেলাম , মা থাকুন ওখানে । সবচে ভাল হয় যদি মা কে রেখে সবাই এখনি অন্য কোথাও চলে যেতে পারতাম । মা তাহলে বুঝবে টেনশন কত প্রকার ও কী কী ?

কাদের সাহেব লোক ভাল । এসেই বললেন , কি করে বুঝব যে আপনারা আপনার বাবাকে খুন করে ফেলেন নি ?
ভাইয়া বললেন , স্যর আপনার সঙ্গে আড়ালে দুটা কথা বলতে পারি ?
জি না । আমি আড়াল কথা শোনার লোক না ।
মা হাউমাউ করে কান্না শুরু করে দিলেন । বাবা হঠাৎ কেন যে এমন একটা কাজ করতে গেলেন মা বুঝতে পারছেন না । কিন্তু এর কারন তো নিশ্চই আছে । ভাইয়া যেমন বলে , প্রথমে cause  তারপর factor . 
আমি বাবার দিকে তাকালাম । দেখলাম তাঁর চোখেমুখে খুব আনন্দ । বললেন , সামরিন আমি বেশ ভাল আছি , নিঃশ্বাসের আর কষ্ট নাই ।
আব্বু তুমি এমন কাজ কেন করলে?
এ তো আল্লাহ পাক আমাকে হুকুম করেছে , তাই ।
গলায় দড়ি দিবার মত এমন একটা জঘন্য কাজ আল্লাহর হুকুমে হইতে পারে কখনও ?
বাবা ফিসফিস করে বললেন , গল্প শুনবি ? শোন তাহলে । এক নবী ছিল । আল্লাহর ঘরে তার যাতায়াত । একদিন আল্লাহ তাকে প্রশ্ন করল , তোমার সবথিক্যা কিসে আনন্দ ?
সে কইল , প্রভু আপনার দর্শনে । 
তবে যাহ্ ! আমার সবথেকে গোপন নামের খোঁজ কর গিয়ে ।
সেই থেকে নবী লুকানো নামের সন্ধানে আছে , কিন্তু নাম মিলে না ।

গল্প শেষ করে বাবা গভীর এক নিঃশ্বাস ছাড়লেন । চৈত্র মাসে পরিষ্কার আকাশে তারাগুলি সব ঝলমল করে উঠল ।

আমি বাবাকে কদম্বুসি করলাম ।


Tuesday, May 1, 2018

सुभाष नीरव

बुझानी है आग

सुभाष नीरव 


प्रेम के पंछी खतरे में हैं
जंगल में नफरतों की आग सुलगी है
हमें अपनी आँख के आँसुओं को
बारिशों में बदलना है !


बरसों बाद

बरसों बाद -
कोई करीब आकर बैठा
सर्दियों की गुनगुनी धूप-सा
बरसों बाद -
किसी ने यूँ हल्के से छुआ
जैसे छूती है हवा हौले से
सिहरन दौड़ाती देह में
बरसों बाद -
यूँ साझे किये अपने दो बोल किसी ने
जैसे घर की मुंडेर पर
आकर करती है चिड़िया
बरसों बाद -
खुशबुओं के सरोवर में उतरा हूँ
डूब जाने के लिए !


समंदर

इस समंदर का क्या करूँ
जो खींचता तो है खूब अपनी ओर
पर मेरी प्यास बुझाने के लिए
चुल्लू भर पानी भी नहीं है जिसके पास
लौटता हूँ -
नदियों की तरफ ही अपनी प्यास लेकर
पर नदियों की चाहतों में भी तो
ये समंदर ही साँस लेता है !


याद की किश्तियाँ

कितना उदास हो जाता है
मेरे अंदर की झील का पानी
जिस दिन नहीं उतरती हैं
तेरी याद की किश्तियाँ इसमें !



प्रेम की बारिश

एक शब्द मेरे पास था
मैंने उसे पानी पर लिखना चाहा
हवा, धूप और आकाश पर भी
पर लिख नहीं पाया
मैं मायूस हुआ

धरती ने कहा -
आ, मैं तेरे लिए सलेट बन जाती हूँ
कागज़ बन जाती हैं
आ, तू लिख मेरी देह पर

मैंने अपने सीधे हाथ की
तर्जनी को बनाया कलम
और मिट्टी में उकेर दिए
ढाई आखर

धरती ने महसूस की
अपनी समूची देह में
एक गुदगुदी मीठी-सी

हवा ने प्यार से सहला दिए
मेरे सिर के बाल
धूप ने चूम लिया मेरा मुख

आकाश देखकर मुस्कराया
पानियों में हुई छटपटाहट
वे बादल बन गए
देखते ही देखते
भीगने लगी सारी कायनात
प्रेम की बारिश में...।

Monday, April 30, 2018

প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত

কবিতার কোন দিন নেই

প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত


তুমি যে বলছো
আজকে দিনটা কবিতার
তবে কেন আমি
প্রত্যহ দেখি ছবি তার?

ধমকে বলেছো
শোনো হে, দিনটা পদ্যের
বোকা কালিদাস
আমিও মন্ত্রমুগ্ধের -

মত কেটে যাই
ডালপালা যত ভাবনার
অক্ষরে বাঁচি, মরি
কি বা যায় আসে তার,

জিতবে তুমিই
শানানো যুক্তি, তর্কে
আমি পরাজিত
নিচেই থাকবো, স্বর্গের

আহা, তাও ভাল
সে স্বর্গসুখ তৃপ্তির -
জ্বলে আর নেভে
অনন্তময় দীপ্তির

মত জেগে থাকা
ঘুমের আড়ালে পদ্য
দু এক কলম
লিখেই ফেলেছি, সদ্য

তবুও বলবে
আজকে দিনটা কবিতার
কেন যে বোঝো না
আমিই যে তার...সবই তা!


উচ্চতা


অবশেষে, আমি পৌছালাম সেখানে
আর ভীষন ভয় পেলাম -

আমার শহরের নাগরিকেরা, শোনো!
কী ভয়ঙ্কর এই স্থান
যেখানে শহরের সমস্ত সিঁড়ি একত্রিত হয়ে
করেছে যে উচ্চতার নির্মাণ

সেখানে কেউ থাকেনা...

~
হিন্দী কবি কেদারনাথ সিং'র (১৯৩৪-২০১৮) কবিতা 'উঁচাই' এর অনুবাদ।

পিতৃব্য


জানি, কখনো সে অর্থে বন্ধুত্ব হয়নি আমাদের।
জানি, কখনো মনে রাখতে পারিনি তোমার জন্মদিন...
জানি, রয়েছে দুটো মানুষের মধ্যে এক পৃথিবী ফারাক
জানি, কখনো জানতে চাইনি 'ভালো আছো' কিনা,

তবুও তুমি শিখিয়েছ হাত ধরে সাদা-কালোর তফাত
তবুও তুমি রেখেছ পিঠে হাত, সমস্ত ব্যার্থতার পরেও-
টেনেছ কাছে তবুও, বুঝিয়েছ শেষেরও আছে শুরু, তাই...
টেনে হিচড়ে দাঁড় করিয়েছ মুখোমুখি যত প্রতিকূলতার

আমি শুধু হেসেছি, ভেবেছি এ কি প্রাচীন ভাবধারা
শান্তিরক্ষক তবু বোঝাপড়ার গান গেয়ে চলেছে নিরন্তর
দুটো মানুষ...দুটো পৃথিবী...মাঝে সেই আবহমান ফল্গুধারা
পার হয়ে আসছে একসাথে, হাতে হাত অখন্ড "সত্তর"...



সিরিয়া


মৃত শিশুদের আত্মারা স্বপ্নে এসে ভিড় করে।

তারা বলে, "ঘুমপাড়ানি গান জানো? এভাবে জেগে থাকতে চাইনা আর!"

আমি জেগে উঠি।
ঘুমজড়ানো গলায় তাদের গান শোনাই।
অজানা, অদ্ভুত ভাষায়...

আর দেখি, আমার পাশে অকাতরে, শান্তিতে ঘুমোচ্ছে আমার সন্তান।

এই সময়,
পৃথিবীর সব ঘুমন্ত শিশুদের মুখ কেন যে একরকম মনে হয় কে জানে...

Sunday, April 29, 2018

नीलम शर्मा

कविता

नीलम शर्मा 'अंशु'


1)
खुद को कभी अकेला मत समझो
अब तुम अकेले नहीं हो
पुष्य, भानु, रुद्र और हम हैं न।
जब भी लगें अंधियारे बादल घिरते से
प्रकाशमय हो उठेगा सारा आलम।

कैसे कोई खुद को अकेला न माने
जब इस धरती पर क़दम रखता है
और कूच करता है तब भी
अकेली नन्हीं सी जान होता है आदमी।

दुनिया के इस मज़मे में
सबके होते हुए भी तन्हा,
अकेला सा ही होता है आदमी।
प्यारा सा बचपन जब जाता है छूट पीछे
मंज़िल की तलाश में बढ़ते हुए
पाता है खुद को अकेला ही आदमी।

सैंकड़ों की भीड़ में हर पल
चेहरे पर मुस्कान लपेटे
सबकी नज़रों को झुठलाते
भीतर ही भीतर कितना तन्हा, अकेला
कैसे कर सकता है इन्कार
भला इस बात से आदमी।

उंगली पकड़ मार्ग पर चलना तो
कोई न कोई सिखा देता है पर
कोई भी ताउम्र साथ नहीं चलता
सफ़र तो अकेले ही तय करता है आदमी
ज़िंदगी के संघर्ष और चुनौतियों से
खुद ही पार पाता है आदमी।



तभी तो शायद ऐकला चौलो रे
कहा था बरसों पहले बाबू रवि ने।
अब इससे बिलकुल इतर
हम तुम्हारे साथ हैं कहा दद्दा ने।

ऐसे में जब साया भी न देता हो साथ
कहना तो दूर सोचने की भी
न हो फुर्सत जहां मानस में
ये जज़्बा पर्याप्त है देता हुआ संबल सा
मानो एक अभिभावकीय हाथ हो साथ
लिए बरगद सी स्नेहिल छत्रछाया
तो कहां अकेला रह जाता है आदमी।

2)
ख़ामोशियों की कहानी
कोई कैसे करे बयां
किस कलम
किस स्याही से?
हर ख़ामोशी कुछ
कहती नज़र आती है।
कभी देखा है ख़ामोश
निगाहों में आँखें डाल ?

कभी देखा है माँ की
उंगली थामे चले जा रहे
बच्चे की मासूमियत को
उस माँ की आँखों में है सपना
कि कल इसी तरह
वो उसकी उंगली थामेगा।

कभी ताका है उन वृद्ध
थकी निगाहों को
जो अतीत की खिड़की से
शून्य में निहारती हुई
सोचती हैं कि क्या
इसी भविष्य का
संजोया था सपना?

या फिर उन बूढ़ी
हड्डियों की आँखों में
जिनके पास सुख-सुविधा का
हर सामां मौजूद है पर
अपने सभी हैं सात समंदर पार
और वे रह गईं हैं बन मात्र पहरेदार
खंडहर होती जाती अट्टालिका की।

पता नहीं कब ज्योत बुझ जाए
कब तेल ख़त्म हो जाए बाती से
हर ख़ामोशी अपने में समोए होती है
एक कहानी को, गर समझ सको
महसूस सको उस ख़ामोश दर्द को।


সোনালী মিত্র

পিস্তল সিরিজ

সোনালী মিত্র


বালি দিয়ে পরজন্ম বাঁধা । আর একটা অন্তরঙ্গ ঘনিষ্ঠ দৃশ্য ।
সমস্ত চুমুগুলো রিলমাস্টারের ব্যাগে । অর্থাৎ তিনিই চুম্বনের দেবতা !
#
আর ওই ফোঁসফোঁস , অষ্টবক্র , মদ্দা ঢেমনাসাপ , নীলসাপ
তোবড়ানো গালের অগস্ত্য তবু গিলে নিচ্ছে লোলুপবিষ ।
শরীর থেকে ঘাম ঝরে গেলে , দেহকে চেনে না দেহ
আর মরতে চাইছে না কুলিকামিন , চটচটে আঠা তখন ঘামে
#
বেহেস্ত চেয়ে চক্রবৃদ্ধি হচ্ছে লোভ । আর একটা বহুরঙ্গ ব্যাঙ্কের
দিকে আফ্রোদিতির মতো । পিস্তল এ-কে সিরিজ নিয়ে লুকিয়ে পড়ছে ।
#
স্নান সেরে উঠে আসছে ,মধুস্তন । বোঁটা পোড়াধান , কালো ।
সর্বনাশ খাতায়-কলমে লিখে ফাঁসি চাইছে একটা শব্দের ফাঁসি
জরায়ুমাটি আমার,কাঙালবিদায় ভঙ্গীতে পিল গিলে জিরো - ওগো জিরো
জিও সিমে হোয়াটস আপ - কল্লোলিনী নাভিভ্রুম দেখ ।
#
তিনরাস্তায় ট্র্যাফিক নিভে পাগল ও কুকুরের খেওখেয়ি -ডাস্টবিন ।
বিধি বাম হচ্ছে , দাবানল খিদে বেঁয়ে সুড়ুত টানছে গাঁজা , মেয়েটিকেও
কম যাবে না - যদিও পাবে না সোনারখাট ।
খ্যাতি এস শব্দে , বউবউ খেলি - শব্দের ধর্ষক জানবে না কেউ ।
তো বোলো ওম শান্তি ওম শান্তি শান্তি ওম


মুদ্রারাক্ষস


পুরনো পয়সা জমিয়ে নিজেকে রাজা সাজাবার
বাবার এক অদ্ভুত নেশা ছিল ।
সেইসব ধাতুর কয়েনের মধ্যে থেকে দুপুর গভীর হলে
বেরিয়ে আসতো সমুদ্র গুপ্তের সারঙ্গীর অলৌকিক রোশনি ,
পাল-সেনদের রক্তমাখা তরবারির সদর্প উল্লাস,অশোকের ধর্মস্ত্রোক।
বাবার শিরায় ছলকে উঠতো মৃত-জমিদারির ক্ষুধার্ত লোলুপ বাঘ
আমরা ভয়ে সিটিয়ে যেতাম মায়ের কোলে ।
বাবা বিপিএল কার্ডে চাল-গমের হিসেবের থলে নিয়ে ঢুকে
যেতেন পুরনো কয়েনের ভিতর ,উন্মাদগ্রস্থ নেশায়
একদিন রাজা হবেন বলে ।
আমরা বাবার বুকের মধ্যে শুনতে পেতাম ধাতব চিৎকার,
আফিম ক্ষেতের মধ্যে অসফল মানুষের নঞ্চর্থক সুরের গোঙানি ।
মায়ের শাক তোলার প্রবল নেশা ছিল
ভূতে পাওয়া মানুষের মতো ছুটে যেতেন খালেবিলে ।
বড় হয়ে বুঝেছিলাম , অভাবী মায়েরা আসলে জ্যান্তভূত , সন্তানের
পেট ভরাতে কোনও অবলম্বন পেলেই ঝাঁপিয়ে পড়তেন তার ওপরে ।
আমারও নেশা আছে সম্পর্ক গিলে খাওয়ার ।
অন্ধকারের মধ্যে খুন করে নিজের আত্মমুখ খাই ,
আর খেতে খেতে দেখি আমার শরীর থেকে মুছে যাচ্ছে ব্যক্তিগত চিত্র
বাবার দীর্ঘছায়া ঘন হচ্ছে আমার মুখের ওপরে ...


অঞ্জন কাঞ্জিলাল

কবিতা

অঞ্জন কাঞ্জিলাল


১।

মনের ঠিক মধ্যিখানে হয় প্রেম -
নয় চূড়ান্ত বিচ্ছেদ, কিছু তো একটা হতেই হবে।
দুগালে টুপিয়ে পড়া জল-
অথবা হঠাৎ শান্ত কোলাহল!
মুখের বাইরে ভিজিয়ে দেওয়া ঠোঁট ,
নয় জীবনের ওলটপালট-
কিছু তো একটা হতেই হবে,
তবেই জেনো নতুন কবিতা জন্ম নেবে ।

২।

সব ভুলেছি তোমায় ছাড়া, উপায় নেই।
স্বপ্ন গুলো হারিয়ে গেল ভাবনাতেই।
ভীড় বাসেতে উঠতে এখন ভয় লাগে,
ব্যস্ত সবাই, কে পালাবে কার আগে!
মধ্যরাতে তোমার জন্য কান্না পায়।
ভালোবাসার মানুষগুলো কলকাতায়।

৩।

চোখ বুঝে নিক চোখের ভাষা
আঙুল বুঝুক হাতের মন।
কোথাও কারো হৃদয় ভাঙে
কেউ কেঁদে নেয় কিছুক্ষণ।

৪।

আজকে রাতের অন্ধকারে
গান থামালো মাঝি।
 শান্ত নদী, সুর তুলে কয়-
বাসলে ভালো বুঝি?
আমার চোখে হেমন্ত রাত
আমার চোখে নীল।
তোমার বুকের দুমুখে ঢেউ-
তোমার ঘরে খিল।
 আমার হাতে তোমার আঁচল,
তোমার হাতে বই।
সেই বইতেও রবীন্দ্রনাথ
আমার কথা নেই!

৫।

এ এক রক্তাক্ত পথ।
যে পথে শিল্প এঁকে বেঁকে চলে।
এ এক শব্দদূষণ।
যেখানে হাসির হাহাকার শোনা যায়।
তুমি যদি শুধু পয়সা চাও
তোমার পথ ও শপথ দুটোই খোলা।
যদি হাততালি চাও।
তবে তুমি মূর্খ, তুমি তালিবান।
তোমার হরস্কোপ প্রত্যেকের ডিনার টেবিলে।

৬।

থাক না তোমার ভালবাসার কথা।
আকাশ এখন মেঘেতে ভরপুর,
এসো না কাল সকাল হবার আগে-
গামছা পরে কাটুক রাতদুপুর।
হয়তো তোমার বুকের কাছেই মন।
আটপৌরে আমার আউটডোর।
কাঁদার জন্যে পুরোটা ডিসকাউন্ট ...
গভীর রাতে গ্যারেজে রাখা ভোর।

৭।

যদি যত্ন করে মুঠোয় ধরো, তবে -
থেকেও যেতে পারি সমান্তরাল।
যদি আবেগ আঁচড়ে নখ বসিয়ে দাও,
লজ্জাবতি হতেও পারি কাল।
ভেজা গলার শব্দ আকাশ গোনে,
শরীর খোঁজে নরম কোলাহল।
তোমার সুরে সুর মেলাতে গিয়ে-
আমার ঘরে বাড়ন্ত হয় চাল।
একটা সময় শুধুই তুমি আমি
একটা সময় - মধ্যে ওরা কারা!
তোমার মাঝে হাজার তুমি এখন,
শিরার বুকে নাচছে উপশিরা।

৮।

জানিনা কে তুমি
ব্যস্ততায় খোলোনি দেরাজ।
অন্ধকারে ছায়াও পালিয়ে যায়।
কেউ ছাড়ে নিজের সমাজ।

জানিনা কে তুমি!
মধ্যরাতে রেস্তরাঁয় ডুবি।
ফেলে গেছ টুকিটাকি ভুলে,
 সেগুলোই তো আমার ভাবি।

৯।

হয়ত কখনো ঘন নীরবতা ফাঁকে
নয়ত সহজ চেনা অচেনার ছকে।
চেয়েছি বোধহয় শরীরে শরৎ এলে,
কিম্বা ভেবেছি ঘুমঘোরে চলে গেলে!
জানিনা একেই ভালবাসা বলে কিনা -
আঙুলে সেতার, বুকে মালকোষ দুচোখে  হাসনুহানা।

১০।

তোমার পিঠেতে নয়খানা কালো তিল -
তোমার জানার কথাও সেটা নয়।
কালোর কালিমা ছোট্ট বিন্দু গুলো,
তোমাকে করেছে উদ্ধত,নির্ভয়।
আমার দৃষ্টি আনমনে অগোচরে,
কলঙ্ক নয় কালো জুপিটার খোঁজে!
কারণ তুমি যে দেখোনি  পিছন ফিরে-
কত কিছু পড়ে কালো রাত্রির ভাঁজে।

১১।

আমি অপেক্ষা করছিলাম
কত রাত কত দুপুরে
তোকেই ভোরবেলা দেখব বলে!
লোকে পাগল বলে গালাগাল দিল,
কেউ কেড়ে নিল মুখের খাবার ...
আমি আত্মজ যন্ত্রণায় চিৎকার করে বললাম-
শালা ভালবেসেছিলাম।
বুদ্ধিজীবী রা বুঝলই না!

১২।

একটা দিন ছিল
জীবন জাপটে ধরেছিল
দম আটকে আসতো...
                      তারপর
ছাড়াতে না পেরে
আমি জড়িয়ে ধরলাম
জীবনকে,
এখন উষ্ণতা পাই
কাচের গ্লাস আর কলাপাতায়-
বেশ ভালোবাসাবাসি হয়ে গেছে -
 অচ্ছুত জীবনের সাথে।

১৩।

আসলে,
যার হাত ধরেছি, তার
অন্য হাতটা অন্য কারোর
অনেক দাবিদার -

নিজের দুহাত জড়িয়ে
তাকে মরি,
প্রাণের ভাষায় অনন্তরাগ
হল না জড়াজড়ি।

১৪।

কতদিন হল কবিতা আসেনি বুকে।
কত যুগ হল প্রাণহীন সহবাস !
খেয়া পারাপারে লাভ লোকসান ঢুকে-
কেটে যায় বেলা, সপ্তাহে বারোমাস।

অঞ্জলি সেনগুপ্ত

 প্রতি অঙ্গ লাগি কান্দে প্রতি অঙ্গ মোর’

অঞ্জলি সেনগুপ্ত 


মধ্য রজনীর দুয়ার মুখ খোলে অবুঝ শীৎকারে
উঠে এলো বিমূর্ত বাসনা কার ? অপরূপ রমণী ,
সঙ্গে জ্ঞানদাস । আনত রূপদগ্ধ  , নিদারুণ
মন্মথ বাণ,  মুহুর্মুহু উন্মত্ত রমণেচ্ছা
প্রতি অঙ্গ লাগি  প্রতি অঙ্গের ক্রন্দন বিবসা । 

আত্মক্রীড় আত্মরামে  অকাম রিরংসা
উন্মত্ত মধুকর ,  হেঁটে যায় অদৃশ্য মায়াতরঙ্গে
 শ্যাম চিত্ত মোহিনী রাধিকা  ।
বাসনাবিন্দুর  ঘননাদে ব্যাকুল জলজ স্থির আর্তনাদ
ঊরুমূলে , মণিবন্ধে আঙুলের দশম যন্ত্রণার
অবরুদ্ধ ক্রদন , শৃঙ্গার কথার নিবৃত্তি সংবাদ ।

যতি ন্যাসী কাঁপে ব্যোম নাদে , -সোহম বৃষ্টি
ঝরে শস্যের বারমাস্যে , বাউল একতারায়
বাঁধে আউলিয়া সুর –‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি’

প্রতি অঙ্গে  আর্তনাদের তীব্র কামড়  ,
              তর্জনী বৃদ্ধা অনামিকা
কনিষ্ঠা মধ্যমার পঞ্চমে বাজে বাঁশি সন্মোহিণী
 পৃষ্ঠ স্পর্শের দহন জ্বালা , কাঁহা বাঁকা বেণুকরী  !
এসো নাভিতে ডুবাও নাভি , কেঁপে উঠুক ভুধর
চেতনার চৈতন্য নামাও জলে স্থলে অন্তরিক্ষে 
সহস্রার ডঙ্কা ডমরু , আন্দারভেদি কুয়াশা শরীর
মাগে পরাপ্রীতি ! যোগ বিষামৃত

কবি জ্ঞানদাস পিরীতি আকর মালায় রূপের পাথারে ভরিল
আঁখি, রামীর উরুসন্ধি মূলে বিভোর  চণ্ডীদাস
লেখে জীবনের ভাষ্য ‘রাই তুমি সে আমার গতি’
অজয়ের জোয়ারজলে পদ্মাবতীর চরণ লেহে
প্রণত  জয়দেবের একটি নমস্কার –‘দেহি পদপল্লবমুদারম’ 

প্রতি অঙ্গে প্রতি অঙ্গ , ভাবে ভাব রসে রস
প্রেমের বিমূর্ত মূর্তি কাঁদে নদীয়ার পথে ...







মুন্সী মহম্মদ ইউনুস

নিশি পুরান

মুন্সী মহম্মদ ইউনুস


১।
নিশি পাওয়া মানুষের মতো পথ হাঁটি।
পায়ের বাঁকা পাতা কেবলই উল্টো দিকে ঠেলে।
এ কোন সাধনা শেখালে সাঁই?
রক্তমাখা শব মাড়িয়ে মাড়িয়ে ...
এমন রাজপথতো চাইনি।
সংবিধানের শপথ অক্ষরের দলমাত্র,
মানুষের রক্ত যখন পশুমাংসের চেয়ে শস্তা।

২।
সুখ আর শিশ্নের সম্পর্ক
যেমত তোমার ও আমার।
সুখের সন্ধানে তোমার আস্ফালন
আমার নিয়ত ধর্ষণ...।

৩।
দোল পূর্ণিমার রাতে, কথা ছিল
ভালোবাসার বৃষ্টিতে ভিজবো দুজনে
কথা ছিলো, বসন্তের রঙ হয়ে
আলো দিবো, জল দিবো
আজ তারাখসা ছাই জমে আছে
ফ্লাটের আনাচে – কানাচে।

Saturday, April 28, 2018

সৌরাংশু

সম্পর্কের গল্প

সৌরাংশু


বল পালাই কোথা
দেশে আর থাকা চলে না…

এই গানটায় একটা লাইন ছিল না? সম্পর্ক টম্পর্ক পাতালে পরে ইত্যাদি। তা সম্পর্কটা কি? এবং কতপ্রকার? 
আগে প্রকারান্তর করি তারপর নাহয় সজ্ঞানে সংজ্ঞা নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করব। সম্পর্ক চার প্রকারঃ

১) জন্মসূত্রঃ বাপ, মা, ধর্ম, জীন, ভাই বোন, খুল্লতাত, পিসতুতো দাদা- এইসব সম্পর্ক জন্মের নাড়ি ধরেই চলে আসে চাইলেও কাটানো যায় না। আর চাইবেনই বা কেন? Already established ব্যাপার স্যাপার রয়েছে, সেখানে আমার মাথা তোমার মুণ্ডু বলে নেচে কুঁদে কি বিপ্লবটা হবে শুনি?

২) কর্মসুত্রঃ এর মধ্যে বন্ধু বান্ধবী, না না না না বল boyfriend, girlfriend সব চলতা হ্যায়। পথচলতি সহযাত্রীর সঙ্গেও তো একটা সুন্দর বোঝাপড়া তৈরী হয়। এই সূত্রের ভালো দিক হলো দড়ি টানা টানি কম।ভালো থাকলে ভালো, নইলে মানে মানে কেটে পড় বাছা। সময় নষ্ট করার মত সময় কোথা?

৩) ধর্মসূত্রঃ এটা কখনও কখনও ২ নম্বরের পরের ধাপ, এবং বেশ জটিল। এ সম্পর্কে “ত্বমসি মম জীবনং…” বলে বুলি কপচানোও আছে আবার খেরোর খাতায় প্রমাণ রাখার গল্পও আছে, এটাও যদি মনে হয় তাহলে ছিঁড়ে ফেলাও যায় তবে কি না সমাজ এবং বিবেক ইত্যাদি রূপোলী পরত চড়িয়ে একটু মজবুত করার চেষ্টা করা হয়েছে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে খোরপোষের হ্যাপা। খামোকা তাই সুস্থ শরীরকে ব্যস্ত করা কেন? কিন্তু “শরীর শরীর তোমার মন নাই কুসুম?” এখানে গিয়েই তো যত চাপ। প্রাপ্তবয়স্ক সম্পর্কগুলি যদি কাগজের বাসিফুল হয়ে থেকে যায় তাহলে তো সুতোর অস্তিত্বই সঙ্কটে পড়ে। মন যদি প্রাণের মানুষ এলে না জাগে তাহলে আর ঘুম ভেঙে কি হবে। তার চলে যাবার শব্দেই তো জগৎ সংসার অন্ধকারে ডুবে যায়।

৪) জন্মান্তরের সম্পর্কঃ “কিঁউ জি? হাম আপকে হ্যায় কৌন?” আছে কোনো উত্তর? নাকি সেই তিনটে ডিবস আর পাঁচটা বৈঠক দিয়ে জড়িয়ে ধরতে গিয়ে জলে? এ সম্পর্কের নাম হয় না। দ্রৌপদী কে ছিলেন শ্রীকৃষ্ণের? অথবা কাবুলিওয়ালা মিনির? বলতে পারো? শুধু মাত্র বন্ধু? নাকি আত্মার সম্পর্ক? এখানে জন্মের সম্পর্ক নেই কর্মের সম্পর্ক নেই ধর্মের সম্পর্ক নেই আছে সেই সুতো যা যুগ যুগ ধরে মানুষের মনের মান আর হুঁশকে নাড়া দিয়ে নাড়াবাঁধা করে রেখেছে। মানুষ মানুষের জন্য- জীবন জীবনের জন্য। যখন একটা জীবন না চেয়েও অন্য জীবনের সঙ্গে জুড়ে যায় তখনই তো মনে হয় এক জন্মে কি এই সম্পর্কের শেষ হবে? নাকি বারে বারে মুকুলের মতো সোনার কেল্লা খুঁজে বেরাবো? মাঝ রাতে কাক্কাজির মত গাইতে বসব, “মেরে নয়না শাওন ভাদো… ফির ভি মেরা মন পেয়াসা…” এই পেয়াস তো বোজার নয়। এই পিয়াসাই তো আশাটাকে বাঁচিয়ে রাখে মানব সম্পর্কের বাঁধন যে তাই মন দিয়েই জুড়ে থাকে।

সম্পর্কটা তাহলে কি? সে কি শুধুই হৃদয়হীন বন্ধন? নাকি মন দিয়ে মনের যত্ন নেওয়া, লেন দেন? নাকি বেহিসাবি হিসাবহীনতা? শুধুই কি Attachment? নাকি সঙ্গে personal ব্যাপারটাও থাকে? খুঁজে দেখুন মনে, ডুবে দেখুন মনে, দেখবেন মাথা তো সবাইকে নিয়ে কাজ করে। কিন্তু মন জানে শুধু নিজেকেই। নিজে ভালো না থাকলে অন্যকে ভালো রাখি কি করে বলুন তো? টস করুন, টস করুন। হেড অথবা টেলের মধ্যে একটাকে বেছে নেবার জন্য নয়। কয়েনটা যখন আকাশে থাকে তখন আপনার মন জেনে যাবে কি চাইছে? হেড না টেল? হেড হলে হেড , use your head and only head and keep no place for heart. আর টেল হলে? Live to tell a tale… গল্প তৈরী হবে, জীবনের গল্প, সম্পর্কের গল্প, যেখানে মানবিক বন্ধনগুলি মানসিক বন্ধনে পরিণত হয়ে সম্পর্কের ভিত্তি মজবুত করবে।

চঞ্চল ভট্টাচার্য

একটি কাল্পনিক কথোপকথন

চঞ্চল ভট্টাচার্য


আচ্ছা, হঠাৎ এমন করে চলে গেলে যে,
চা জুড়িয়ে জল হয়ে গেল।
হুম্ম, একটা ফোন এসেছিল, দরকারি।
উফফ, কিসের যে এত দরকার মানুষের?
বুঝিনা বাপু।
তোমায় একটা কথা জিজ্ঞেস করি?
শ্যামনগরের ছেলেটি কেন অমন করে চাইল?
মনে হচ্ছিল, মাথা ভেঙে ফেলি।
আচ্ছা,  তাই নাকি?
তবে তো আমিও বলতে পারি
পাটুলির মহিলার কথা, উফফ, কি ন্যাকা!
কেমন ঢলে ঢলে পড়ছিল তোমার গায়ে?
যা বাব্বা, সে আবার কে?
জানা আছে, সব পুরুষ ই সমান।


অদর্শন



ঠিক তিনদিন তোমার জন্য
কিচ্ছু লিখিনি।
জানো, লেখা আসছে না,
আচ্ছা, কেন বলো তো?
এটা কি এই জন্য
কতদিন তোমার কপালের
মস্ত টিপ দেখিনি?
আলতো হাতে সরাইনি
তোমার এলে পড়া চুল?
তুমি স্নান সারার পর
তোমার মাথা থেকে
একটা অদ্ভুত গন্ধ বের হয়,
কি যে মাদকতা তাতে
উফফ, সত্যি,
বলে বোঝাতে পারব না।
এই শোনো, তুমি কি গতকাল
সেই নীল শাড়িটি পরেছিলে?
অদ্ভুত সুগন্ধী মেখে
গালে হাত দিয়ে
তাকিয়েছিলে ওই দুরের আকাশে?
তোমায় কতদিন দেখিনি,
খুব দেখতে ইচ্ছে করছে।

কবিতার জন্য


শুধু কবিতার জন্য
অনায়াসে প্রত্যাখ্যান করতে পারি অমরত্ব,
কবিতাকে ভালোবেসেই
হাতে তুলে নিতে পারি গান্ডীব,
কবিতাকে ভেবেই,
পেরিয়ে যেতে পারি
গোবি মরুভুমি বা কারাকোরাম পর্বত।
শুধু কবিতার কথা বলেই
তোমার জন্য লিখে ফেলতে পারি
সুবিশাল মহাকাব্য।
একলব্য ও হতে পারি একদিন
কবিতা, তোমার জন্য ই
আমার স্বাধীনতা,
বিদ্রোহ, প্রেম, আনন্দ।
আমার এই শেষ হতে থাকা সময়ে
শুধু কবিতার জন্য ই
পান করি হলাহল অমৃত।

মৌমিতা মিত্র

তারকোভস্কির ঘরবাড়ি 

মৌমিতা মিত্র


‘ছ্যাঁকা’ থেকে ছ্যাঁক মুছে যাবার পর যে ‘আ--হ’  জুড়ুনিটা আসে-বিয়ে,আনকোরা প্যাকেটে মোড়া স্বামীর হাত ধরে কলকাতা থেকে উত্তর ভারতের ঝাঁ চকচকে মলমোহিত শহরটিতে জুড়ে বসার পর সেই জুড়ুনি এল মনে। হাঁফ ছাড়লাম। সঙ্গে খানিকটা জলচোখ। একটা আস্ত কলকাতাকে উদোম রেখে এক ঘোমটায় গাঁওনি’ হয়ে গেলাম। কেবল বড় বড় মোটা মোটা ভি আই পি তে ‘ক’ এর শুঁড় ‘ল’এর লকলক, ‘কা’ এ কান্না। ‘তা’ এ তারকোভস্কি।

আমার পাগল দুই বন্ধু, যাদের সঙ্গে একটা এগরোলের সাড়ে তেত্রিশ শতাংশ সাবাড় করতাম দেশপ্রিয়র  ফুটে আর  আকাশ আমাদের দিকে চেয়ে ভাবত কবে শালা এদের পায়ে গড়াগড়ি খাব সেই ছন্ন ছিন্ন মস্তানদের থেকে  বিয়েতে উপহার পাওয়া  ‘তারকোভস্কির ঘরবাড়ি’ তে হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়লাম।   

একটা পাগলাঝোরা
আতঙ্ক শিয়র উত্তেজনা
গোধূলির গলগল
জোনাক-ঝমঝম

        ছোটবেলা থেকেই এমনি সৃষ্টিছাড়া আমার মন- কেমনের সংসার। ছোট টিফিনের পর সবাই কেমন মন দিয়ে গোরু- মোষ খেদিয়ে বেড়াত, আমি কেবল হেড ডাউন করে ছোট মাঠটার উপর মশারির মত মেঘের ঝুলে পড়া দেখতাম, ঘাসেদের ঘনত্ব মাপতাম। আলোর  সংসার কেমন গুটিয়ে  ছোট হয়ে আসত। ঘাসগুলো আকাশের দাঁড়ি।  বড় টিফিনে সবাই যখন কানামাছি হয়ে ভোঁ ভোঁ করত আমি তখন রামধনুর দিকে ড্যাবা ড্যাবা মেলে  নট নড়ন, নট চড়ন। শেষটায় পাতা নড়ত; জল পড়ত। এই তাবৎ সংসারে আমি একদিন থাকব না কিন্তু  আকাশটা থাকবে রামধনুটা সময়মতোই ঝিকিয়ে উঠবে, এই মাঠ থাকবে সাদা নীল লুকোচুরি মেয়েরা  বোগাস বোগাস ছুটবে, তাদের মধ্যে কি কোন একটা  গেরেম্ভারী মেয়ে তখনও খেলা ফেলে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকবে ঐ রঙ্গীন নাটুকেপানার দিকে আর ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাবে গোলাপী সংলাপে? 

তো, হল কি, সেই গোলাপী একটু একটু করে আমার গালে, চিবুকে,  চিকুরে, যোনি মলাটে রেণু রেণু হল আর  আমি গলগলে ধোঁয়াভর্তি মাথায়  লেপের তলায় একলা পুড়তে পুড়তে বড় হয়ে গেলাম।   

এখন, কথা হল তার সঙ্গে  তারকোভস্কির সম্পর্ক কি? সম্পর্ক সেই গোলাপিত্বের। আমার সেই অনন্যগহন – যেখানে পাতা নড়ে জল পড়ে  সুনামি হয় তারপর নতুন অন্ড ব্রহ্ম মনুত্বে মাথা তোলে কিংবা কল্প ভ্রষ্ট হয়  ঠিক  সেইখানটিতে  তারকোভস্কি  ফেললেন একটি নান্দনিক নোঙ্গর।

বার্গম্যানের ঘড়িতে কাঁটা ছিল না । সালভাদর দালির ঘড়ি এলিয়েছিল গাছে কিন্তু তারকোভস্কির কোন ঘড়ি নেই, আছে শুধু শ্যাওলা। সেই শ্যাওলার খাঁজে খাঁজে  জীবাশ্মের কারুকাজে করুণ কোলাজ। তারকোভস্কির জায়মানতা ছলোছলো থেকে ছপছপ ছাপিয়ে সমুদ্দুর। সাঁতার কাটতে কাটতেই তো আমরা আসি।  ছিঁড়ে বেরোই মায়ের গর্ভ যে মা- বাবার জন্য বসে থাকে অপেক্ষায়; বাবা ফেরে না। তারকোভস্কির বাবা। অগস্ত্য কবি ফেরেন নি আর।  মায়ের কপালে ঘামের ফোঁটা যম দুয়ারে পড়ল কাঁটা বালাই ষাট। মায়ের কি পালালে চলে। ছায়ের হাঁ এ খড়কুটো কে দেবে?

এক ‘মিরর’ এই কতরকমভাবে  নারীকে দেখেছেন। যে মা প্রতিমুহুর্তে নিজের ও পুত্রের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অনিশ্চয়তায় ভোগেন, তিনিই আবার অন্য আয়নায় ছিন্নমস্তার অপরূপ এলোকেশী পাগলামিতে মনে ছ্যাঁৎ ধরিয়ে দেন। তারকোভস্কির নারী শুয়ে থাকেন বিছানা থেকে এক স্বর্গ উপরে।তার কুলকুন্ডলিনী নেমে আসে বিছানায় কিন্তু স্পর্শ করে না শয্যাকামুক। তার মাথার উপর দিয়ে উড়ে যায় মোক্ষকামী  শ্বেত কপোত অবিদ্যার দ্বার থেকে জোছন আলোকে।

তাঁকে দেখে বুঝেছি, জল-বৃষ্টির দেবতা ইন্দ্র নয়, তারকোভস্কি। প্রতিটি টিপ প্রতিটি টুপ যেন বিগ্রহে বিরাজে তাঁর সিনেমায়। সচন্দন গন্ধপুষ্পে ভরে ওঠে মন তাঁর টাপুরারতিতে।

প্রতিটি অণু কাদামাটি টুকরো পাথর পুজোর থালায় নিবেদিত প্রাণ। তাঁর দেশে আগুন ঝরে জল জ্বলে যায়। আসলে সীমার অপারে কারোরই কোন চরিত্র থাকে না বা মহানুভব মহৎকে  নিজ নিজ চরিত্র দান করে।

আমরা শুধু সীমান্ত যাপনে ‘স্টকার’ এর মত নুনের সমুদ্রে থমকে দাঁড়াই, লোনালীন হতে হতে মোক্ষম বা মোক্ষের দোরগোড়ায় এসে ভম্ব কিংবা হত হয়ে বসে থাকি অতীত ভবিষ্যৎ  আর আমি, আমরা তিনজন। থ্রি ইডিয়টস। তিন ইয়ার। মহামায়ান পিয়াসে কাষ্ঠ মারে জিভ। বোতল আসে না। বৃষ্টি আসে ঝেঁপে।

Facebook Comments