html

Showing posts with label মৌমিতা মিত্র. Show all posts
Showing posts with label মৌমিতা মিত্র. Show all posts

Saturday, July 28, 2018

তামিমৌ ত্রমি

ঠান্ডা চোখের ত্রিদেবী

তামিমৌ ত্রমি


বিস্ফোরণ।  দাউদাউ। ঝলসে যাওয়া টায়ার। ইউনিফর্ম শিশুদের আনন্দলাফ মিলিটারি বুটের নায়াগ্রা ঝাঁপে তলিয়ে যাওয়া। তবু তারই মধ্যে আদম ঈভের  চুড়ি টেনে ধরে।  ঈভ সে চুড়ি উন্নাসিক ব্ল্যাকহেডস কাঁপিয়ে ভেংগে দিয়ে চলে যায়। কিন্তু কোথায় যাবে সে? তার বাবা মাকে তো মিলিটারীরা তার সামনে মাংসপিন্ড করে দিয়েছে। তার দিদিকে যখন আর্মির লোকটা একান্ন খন্ডে শক্তিপীঠ করছিল আর হাত দিয়ে তাকে ইশারা করছিল পালিয়ে যাবার জন্যে সেইদিনই তার একশো বছর পেরিয়ে গেছে। তার কোন পরিবার নেই। একটি প্রাগৈতিহাসিক ঝুলি আছে। কোথায় যাবে সে? তাই সে ফিরে আসে সেই চুড়িতে টান দেওয়া ছেলেটির কাছে। শেষ অংকে  একজন মানববোমা ফিরে যায় একজন মানবের বুকে। আহ, কি প্রশান্ত প্রগাঢ় বিস্ফোরণ!
'দিল সে'। যে যুগে নায়িকাকে মরা বাপের বুকে মাথা রেখে কাঁদতে হলেও আইশ্যাডো মাসকারা আর ক্যাটক্যাটে লিপ্সটিক পরতে হোত, সেখানে 'দিল সে' র মণীষা' র যেন আড়াইশো বছর বয়স। চোখ কোটরাগত। একটা বিছানা পেলেই যেন ঘুমিয়ে পড়বে। জিয়ন কাঠি আসবে না। এই সিনেমা আমাকে অবাক, আহত ও অনশ্বর করে। বিশেষ করে মণীষার স্নানদৃশ্য। শাহরুখের চোখ  ধীরে ধীরে দরজা ঠেলে ঢুকল। নয়নচোরেরা যখন  লিংগ গুহ্য নাভি পেরিয়ে অনাহত বিশুদ্ধ ছুঁয়ে আজ্ঞায় গিয়ে বিস্মিত ও স্থানু হল- মণীষা মাথায়  একঘটি জল ঢালতে ঢালতে ঘাড় ঘুরিয়েচোখ ভাসিয়ে দিল শাহরুখের দিকে।  ঠান্ডা ইস্পাতের চোখ। শাহরুখ যেন ক্যাপ্টেন নেমো। নো ওয়ান।   যে মেয়ে নিজের গোটা পরিবারকে কসাইদের হাতে মাংস হয়ে যেতে দেখেছে, তাকে  আবার  ঘটিহাতা মেয়েমানুষ মাফিক মাংস আগলানোর ঢং করতে হবে!  ওই আদ্যারূপী ইস্পাত -ঔদাসীন্যকে অতিক্রম করা পুরুষের সাধ্য নয়। তাই সে চিরকাল দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে থাকে- দর্শক,  ভক্ত, শরণার্থী  হয়ে।

চন্দ্রচূড়ের সংগে দেখা করতে এসেছে টাব্বু। দুজনেই দেখছে দুজনকে। কসাইয়ের করাতে শানের শব্দ।  অন্তিম  রক্তমাংস ধুকপুকবিশিষ্ট। গলায় ঘন্টা বাঁধা দুটি অবলা জীব  পরস্পরকে দেখছে। চন্দ্রচূড় আর টাব্বু।
দেখছে।
দেখছে।
দেখেই যাচ্ছে।
চন্দ্রচূড়ের দৃষ্টি ক্লান্ত। পুলিসের প্রহারে ক্ষতবিক্ষত চোয়াল, এক চোখ বোজা  আর এক অপাংগ চুঁইয়ে পড়া রক্ত-দৃষ্টি যতদূর অস্তমিত মুহ্যমান হতে পারে, ততদূর। কিন্তু তাব্বুর দৃষ্টি ঠান্ডা।  ফ্রিজ থেকে বার করা দুধের দুটি শবাধারে একটি করে নিস্পন্দ মার্বেল।  দুটি চোখ। তাব্বুর। সে চোখ দুনিয়াদারি বুঝে গেছে। সে বুঝে গেছে কিভাবে একটা ছোট্ট 'মাচিস' থেকে আগুন লেগে যায় চরাচরে। আগুনের আচে  চোখ সয়ে যেতে যেতে গল্পের শেষ উলটে যায়। প্রেমিকরা সন্ত্রস্ত হতে হতে সন্ত্রাসবাদী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে গরাদের ওপারে। শুধু ঠান্ডা চোখ আর দী- ঈ-ঈ-র্ঘ সায়ানাইড চুম্বন ছাড়া কিছুই দেওয়ার থাকে না। এ  বড় বিচিত্র অভিযাত্রা।আচ্ছা, এলার মুখে বিষের পাত্র তুলে দেওয়ার সময়  অতীনের চোখদুটোও কি টাব্বুর মতো ঠান্ডা ছিল?

সায়ানাইড। ধোঁয়া ধোঁয়া নীল। নীল গলা দেহ। নীলঅঞ্জনঘন মেঘের হারেম। বিন্দু বিন্দু বৃষ্টি রক্ষিতা। তার নীচে একটা ছাদ। সেই ছাদে 'যারা বৃষ্টিতে ভিজেছিল' তাদের একজন - ইন্দ্রাণী হালদার। ছাদ থেকে জামাকাপড় তুলছিল সে তড়িঘড়ি। বৃষ্টি আসছে। তার মধ্যে হঠাত বজ্র হাঁকলেন শাশুড়ি- বাঁজা মেয়েছেলে। ইন্দ্রাণী চোখ তুলেছিল। অপলক। ঠান্ডা। স্ফটিক। শাশুড়ি ঐ চোখের দিকে তাকাতে পারেন নি।  তার সোয়া মন যে জানে, সন্তানহীনতার জন্য আসলে তার ছেলেই দায়ী। তবু পৌনে মনকে তিনি পুরুষতান্ত্রিক টিক টিকোচিত করে রেখেছেন। কিন্তু শেষমেশ ধরা পড়ে গেলেন। বৌমা'র শান্ত শীতল আগুন চোখের কাছে। পালিয়ে গেলেন। তলিয়ে গেলেন।
ফিটিং বোতল। হাস - ফুল চেনস্টীচ সাদা টেপজামা, ভূত, কৃমি, ক্যান্সারফোবিয়া, অংক ক্লাস,  কোলাইটিস,  অংক খাতার পেছনে কবিতা লিখে গালাগাল দিনের পর দিন পেন্সিল হারিয়ে দুপুরের পর দুপুর লাঠির বাড়ি, পথের বাঁকে চৌরাস্তার মোড়ে রবিনজরুলি নয়নে চোখ পড়ে গেলে মন- জিহবায় রসার্ত চেটেপুটে ওড়নায় মুখ মুছে ঘরের মেয়ে ঘরে ফিরে আসা- গভীর রাত্রে কুন্তীমন্ত্রে সেই নয়নধরকে  পাশবালিশে আমন্ত্রণ- দুধের সাধ পাশবালিশে না মেটা জনিত কষ্টে পাশবালিশকেই 'মা' করে জড়িয়ে অশ্রুসিক্ত ঘুমিয়ে পড়া-

প্রতিটি কষ্ট প্রতিটি পরাজয় প্রতিটি মৃত্যুর মাঝখানে আমার এই ঠান্ডা চোখের তিন নারী দাঁড়িয়ে থাকে ব্রহ্মাণী বৈষ্ণবী মাহেশ্বরীর মতো। 'দিল সে' র মণীষা নিজের নষ্ট জীবন  ধ্বংস করে অনাবিল জগত সৃজনের পথ দেখিয়ে যায়। 'যারা বৃষ্টির..' ইন্দ্রাণী ছাদের দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়েও তার  মানহুঁশধর্ম পালন করে চলে আর  'মাচিস' এর টাব্বু নীলকন্ঠে সায়ানাইড ধারণ করে ট্রাকের খড়ে চিতা এলিয়ে  এগিয়ে চলে কল্পান্তের পথে।


Saturday, April 28, 2018

মৌমিতা মিত্র

তারকোভস্কির ঘরবাড়ি 

মৌমিতা মিত্র


‘ছ্যাঁকা’ থেকে ছ্যাঁক মুছে যাবার পর যে ‘আ--হ’  জুড়ুনিটা আসে-বিয়ে,আনকোরা প্যাকেটে মোড়া স্বামীর হাত ধরে কলকাতা থেকে উত্তর ভারতের ঝাঁ চকচকে মলমোহিত শহরটিতে জুড়ে বসার পর সেই জুড়ুনি এল মনে। হাঁফ ছাড়লাম। সঙ্গে খানিকটা জলচোখ। একটা আস্ত কলকাতাকে উদোম রেখে এক ঘোমটায় গাঁওনি’ হয়ে গেলাম। কেবল বড় বড় মোটা মোটা ভি আই পি তে ‘ক’ এর শুঁড় ‘ল’এর লকলক, ‘কা’ এ কান্না। ‘তা’ এ তারকোভস্কি।

আমার পাগল দুই বন্ধু, যাদের সঙ্গে একটা এগরোলের সাড়ে তেত্রিশ শতাংশ সাবাড় করতাম দেশপ্রিয়র  ফুটে আর  আকাশ আমাদের দিকে চেয়ে ভাবত কবে শালা এদের পায়ে গড়াগড়ি খাব সেই ছন্ন ছিন্ন মস্তানদের থেকে  বিয়েতে উপহার পাওয়া  ‘তারকোভস্কির ঘরবাড়ি’ তে হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়লাম।   

একটা পাগলাঝোরা
আতঙ্ক শিয়র উত্তেজনা
গোধূলির গলগল
জোনাক-ঝমঝম

        ছোটবেলা থেকেই এমনি সৃষ্টিছাড়া আমার মন- কেমনের সংসার। ছোট টিফিনের পর সবাই কেমন মন দিয়ে গোরু- মোষ খেদিয়ে বেড়াত, আমি কেবল হেড ডাউন করে ছোট মাঠটার উপর মশারির মত মেঘের ঝুলে পড়া দেখতাম, ঘাসেদের ঘনত্ব মাপতাম। আলোর  সংসার কেমন গুটিয়ে  ছোট হয়ে আসত। ঘাসগুলো আকাশের দাঁড়ি।  বড় টিফিনে সবাই যখন কানামাছি হয়ে ভোঁ ভোঁ করত আমি তখন রামধনুর দিকে ড্যাবা ড্যাবা মেলে  নট নড়ন, নট চড়ন। শেষটায় পাতা নড়ত; জল পড়ত। এই তাবৎ সংসারে আমি একদিন থাকব না কিন্তু  আকাশটা থাকবে রামধনুটা সময়মতোই ঝিকিয়ে উঠবে, এই মাঠ থাকবে সাদা নীল লুকোচুরি মেয়েরা  বোগাস বোগাস ছুটবে, তাদের মধ্যে কি কোন একটা  গেরেম্ভারী মেয়ে তখনও খেলা ফেলে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকবে ঐ রঙ্গীন নাটুকেপানার দিকে আর ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাবে গোলাপী সংলাপে? 

তো, হল কি, সেই গোলাপী একটু একটু করে আমার গালে, চিবুকে,  চিকুরে, যোনি মলাটে রেণু রেণু হল আর  আমি গলগলে ধোঁয়াভর্তি মাথায়  লেপের তলায় একলা পুড়তে পুড়তে বড় হয়ে গেলাম।   

এখন, কথা হল তার সঙ্গে  তারকোভস্কির সম্পর্ক কি? সম্পর্ক সেই গোলাপিত্বের। আমার সেই অনন্যগহন – যেখানে পাতা নড়ে জল পড়ে  সুনামি হয় তারপর নতুন অন্ড ব্রহ্ম মনুত্বে মাথা তোলে কিংবা কল্প ভ্রষ্ট হয়  ঠিক  সেইখানটিতে  তারকোভস্কি  ফেললেন একটি নান্দনিক নোঙ্গর।

বার্গম্যানের ঘড়িতে কাঁটা ছিল না । সালভাদর দালির ঘড়ি এলিয়েছিল গাছে কিন্তু তারকোভস্কির কোন ঘড়ি নেই, আছে শুধু শ্যাওলা। সেই শ্যাওলার খাঁজে খাঁজে  জীবাশ্মের কারুকাজে করুণ কোলাজ। তারকোভস্কির জায়মানতা ছলোছলো থেকে ছপছপ ছাপিয়ে সমুদ্দুর। সাঁতার কাটতে কাটতেই তো আমরা আসি।  ছিঁড়ে বেরোই মায়ের গর্ভ যে মা- বাবার জন্য বসে থাকে অপেক্ষায়; বাবা ফেরে না। তারকোভস্কির বাবা। অগস্ত্য কবি ফেরেন নি আর।  মায়ের কপালে ঘামের ফোঁটা যম দুয়ারে পড়ল কাঁটা বালাই ষাট। মায়ের কি পালালে চলে। ছায়ের হাঁ এ খড়কুটো কে দেবে?

এক ‘মিরর’ এই কতরকমভাবে  নারীকে দেখেছেন। যে মা প্রতিমুহুর্তে নিজের ও পুত্রের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অনিশ্চয়তায় ভোগেন, তিনিই আবার অন্য আয়নায় ছিন্নমস্তার অপরূপ এলোকেশী পাগলামিতে মনে ছ্যাঁৎ ধরিয়ে দেন। তারকোভস্কির নারী শুয়ে থাকেন বিছানা থেকে এক স্বর্গ উপরে।তার কুলকুন্ডলিনী নেমে আসে বিছানায় কিন্তু স্পর্শ করে না শয্যাকামুক। তার মাথার উপর দিয়ে উড়ে যায় মোক্ষকামী  শ্বেত কপোত অবিদ্যার দ্বার থেকে জোছন আলোকে।

তাঁকে দেখে বুঝেছি, জল-বৃষ্টির দেবতা ইন্দ্র নয়, তারকোভস্কি। প্রতিটি টিপ প্রতিটি টুপ যেন বিগ্রহে বিরাজে তাঁর সিনেমায়। সচন্দন গন্ধপুষ্পে ভরে ওঠে মন তাঁর টাপুরারতিতে।

প্রতিটি অণু কাদামাটি টুকরো পাথর পুজোর থালায় নিবেদিত প্রাণ। তাঁর দেশে আগুন ঝরে জল জ্বলে যায়। আসলে সীমার অপারে কারোরই কোন চরিত্র থাকে না বা মহানুভব মহৎকে  নিজ নিজ চরিত্র দান করে।

আমরা শুধু সীমান্ত যাপনে ‘স্টকার’ এর মত নুনের সমুদ্রে থমকে দাঁড়াই, লোনালীন হতে হতে মোক্ষম বা মোক্ষের দোরগোড়ায় এসে ভম্ব কিংবা হত হয়ে বসে থাকি অতীত ভবিষ্যৎ  আর আমি, আমরা তিনজন। থ্রি ইডিয়টস। তিন ইয়ার। মহামায়ান পিয়াসে কাষ্ঠ মারে জিভ। বোতল আসে না। বৃষ্টি আসে ঝেঁপে।

Facebook Comments