html

Showing posts with label চৈতালি দাস. Show all posts
Showing posts with label চৈতালি দাস. Show all posts

Sunday, July 29, 2018

চৈতালি দাস

এক বিকেলের  গল্প


চৈতালি দাস



পরমেশ বাজার থেকে এসে থলিটা রান্নাঘরের দরজার পাশে নামাতে নামাতে বলল, শুনছো আজ তাড়াতাড়ি বেরোবো অফিসে, নতুন একটা কাজের ব্যাপারে  মিটিং আছে।
নীলা  হাতের কাজ ফেলে থলি থেকে তরকারি পাতি নামাতে গিয়ে দেখলো আজও আদা আনেনি পরমেশ। ব‍্যস , সকাল সকাল নীলায মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে গেল।
একে তো পরমেশের অফিস বেরোনোর সময়ের কোনো ঠিক থাকে না, কখন বেরোবে তা আগে থেকে কিছু জানায়‌ও না ,তারপর হুড়োহুড়ি করে কোনোরকমে রান্না নামিয়ে খেতে দিতে হয়।

কিছু দিন হলো পরমেশ ওর খবরের কাগজের চাকরিটা ছেড়ে​ নিজের পাবলিশিং হাউস খুলেছে । একবার বাড়ি থেকে বেরোলে কাজ ছাড়া আর অন্যকোনো দিকে খেয়াল থাকেনা পরমেশের। এমনকি খেতেও ভুলে যায় । দিনের পর দিন অনিয়ম করতে করতে পেটে আলসার বাঁধিয়ে বসেছে সে । এখন ডাক্তারের কড়া নির্দেশে বাইরের খাবার খাওয়া  আর তেল ,মশলা, ঝাল এক্কেবারে বন্ধ   । তাই পরমেশ অফিস বেরোনোর আগে ভাত আর একটা পাতলা ঝোল যে ভাবেই হোক রেঁধে খাইয়ে পাঠায় নীলা।

 বাজারের থলি থেকে মাছ বের করে রান্নাঘরের বেসিনে রেখে নীলা বাজারে ছুটলো আদা আনতে কারণ এখন পরমেশ কে আর বাজারে পাঠানো যাবে না। সে এতক্ষণে বাথরুমে ঢুকে গেছে । দাড়ি কামিয়ে, স্নান, আহ্নিক সেরে ঠাকুরঘরে ঢুকবে। সেখানেই প্রায় তিরিশ চল্লিশ মিনিট কাটিয়ে জামা কাপড় পরে, চুল আঁচড়ে সোজা খাবার টেবিলে এসে বসবে ,এই ঘন্টা খানেক সময়ের মধ্যেই​ পরমেশের খাবার বেড়ে টেবিলে দিতে হবে নীলা।

   স্টেশনের কাছে লেভেল  ক্রসিং পেরোলেই রাস্তার দু ধারে সকাল ছ'টা বাজতে না বাজতেই বাজার বসে । সরু রাস্তা তখন আরও সরু হয়ে যায়। সাইকেল, রিক্সা,স্কুটার ,গাড়ী সব মিলিয়ে রাস্তায় হাঁটার জায়গা পাওয়া যায় না এই সময়টায়।

রোদ্দুর নেই , কিন্তু ভ্যাপসা গরমে নীলার সারা শরীরে ঘামাচি গুলো চিড়বিড় করছে  । ওড়নায় ঘাম মুছতে মুছতে একটা রিক্সার একেবারে সামনে এসে পড়লো সে।  একে তো গরমে কাহিল,  তায় আবার রান্নার তাড়া । রাগের মাথায় রিক্সা ওয়ালা কে খ্যাঁকানি  দিতে গিয়ে দেখে রিক্সায় বসে আছে আভেরী ! চোখাচোখি হতেই আভেরী ও নীলাকে  কে চিনতে পারলো । এই ভীড়ের মাঝে রিক্সা থামিয়ে কথা বলতে গিয়ে রাস্তায় যানজট হয়ে গেছে দেখে আভেরী তাড়াতাড়ি পার্স থেকে ওর ভিসিটিং কার্ড টা বের করে নীলার  হাতে দিয়ে বললো, দুপুরে কথা বলিস ,এখন মায়ের ব্লাড রিপোর্ট আনতে যাচ্ছি রে , খুব তাড়া আছে তাই আর রিক্সা থেকে নামলাম না।নলিনী ও সংক্ষেপে বললো , হ্যাঁ রে, আমিও ,রান্না পড়ে আছে।

আভেরী কে দেখে নীলা সেই  তিরিশ বছর পিছনে ফিরে গেলো স্কুলের দিনগুলোতে। আভেরী  যেমন মেধাবী ছিল তেমন সুন্দরী ছিল  ,  আজও ঠিক সেই রকমই সুন্দর আছে ও বরং চেহারায় একটু মাংস লেগে লাবণ্য যেন আরো বেড়ে গেছে।
 গ‍্যাসের দুটো আভেনের একটায় ভাত বসিয়ে , অন্যটায়  মাছটা সাঁৎলে একটু কালোজিরে কাঁচালঙ্কা ,নুন ,হলুদ ,আদা জিরে বাটা দিয়ে ফুটিয়ে ঝোল নামিয়ে পরমেশের খাবার টেবিলে বসার আগেই ভাত বেড়ে ফ‍্যান চালিয়ে খাবার ঠান্ডা হতে দিল,তা না হলে পরমেশ গরম ভাত খেতে পারেনা।
এমন হুড়োহুড়ি করে যেদিনই পরমেশকে খেতে দেয় সেদিনই মেজাজের পারা চড়ে থাকে নীলার , সেই সঙ্গে নন স্টপ কাজের ফিরিস্তি চলতে থাকে পিন কাটা রেকর্ডের মত।
প্রথম প্রথম পরমেশ এই চিৎকার চেঁচামেচি তে বিরক্ত হয়ে নিজেও দু-চার কথা শোনাত,  আজকাল সয়ে গেছে , কোনটার পর কোনটা নীলা বলবে তা ও মুখস্থ হয়ে গেছে পরমেশের , কিন্তু আজ নীলাকে শান্ত দেখে পরমেশ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো --কি ব্যাপার ! আজ বাড়িতে কারফিউ লেগেছে মনে হচ্ছে,এত শান্তি ! নীলা তোমার শরীর ঠিক আছে তো?
নীলা নিস্পৃহভাবে জবাব দিল, হ্যাঁ ঠিক আছি, আমার আবার কি হবে?
--না মানে ইয়ে মানে যা গরম পড়েছে এর মধ্যে তোমাকে এত ছোটাছুটি করতে হচ্ছে।  আমি তো ঐ বাজার টুকু ছাড়া আর কিছুই করিনা ,তাও আবার প্রায়ই কিছু না কিছু ভুলে যাই আনতে ,যেমন আজ আদা আনতে ভুলে গেলাম আর তোমাকে ছুটতে হল।
কথাগুলো বলতে বলতে পরমেশ খেয়াল করলো নীলা  গুনগুন করতে করতে পাশের ঘরে গিয়ে শব্দ করে আলমারী টা খুললো। নীলাকে এতখানি অন্যমনস্ক দেখে পরমেশ বেশ চিন্তায় পড়ে গেল কিন্তু  অফিসের দেরী হয়ে যাচ্ছে দেখে আর কথা না বাড়িয়ে 'আসছি'  বলে ব‍্যাগটা নিয়ে বেরিয়ে গেল।

                                        ২
দুপুর দুটো বাজছে, নীলা সব কাজ সেরে সুরে পার্স থেকে আভেরীর ভিসিটিং কার্ড টা হাতে নিয়ে এ সি চালিয়ে বিছানায় শুলো ,কার্ডটা লাল রঙের তাতে সোনালী রঙে লেখা
Averi Mitra.
Online Culinary School.
Culinary School সম্বন্ধে নীলার কোনো আইডিয়া নেই।
এই শব্দটা আজ প্রথম সে শুনলো।

স্কুলে পড়াকালীনই আভেরী ক্লাশের মেধাবী ছাত্র ছাত্রীদের তালিকায় ছিল। উচ্চ মাধ্যমিকে খুব ভালো ফল করার পর প্রেসিডেন্সি কলেজে জুলজী নিয়ে ভর্তি হয়, ওখান থেকে পাশ করার পর‌ই আভেরীর বিয়ে হয়ে যায়। আজ প্রায় তিরিশ বছর পর এই ভাবে আভেরীর সাথে দেখা হ‌ওয়াটা খুবই আশ্চর্যের লাগছে নীলার ।

--হ‍্যলো কে ? আভেরী বলছিস ?

--বল নীলা  ,আমি তোর ফোনের অপেক্ষায় ছিলাম।  তোর বাড়ি  ঐ পাড়ায়? কাল তখন মায়ের রিপোর্ট গুলো নিয়ে ডাক্তারের কাছে দেখানোর জন্য আ‍্যপয়েনমেন্ট নেওয়া ছিল, একটু দেরী হয়ে গেলে ডাক্তার উঠে যায় তাই তোর সাথে কথা বলতে পারলাম না,স‍্যরি রে।

--না ,না কিছু মনে করিনি , তাছাড়া আমার ও তাড়াহুড়ো ছিলো ,পরমেশের  অফিসের রান্না হয়নি তখনো।

--ওও তোর বরের নাম পরমেশ? কি করে ?

---এখন‌ কিচ্ছু বলবো না, দেখা হলে সব বলবো,এখন এটা সাসপেন্স থাক।আজ ঐ ভীড়ের মাঝে তোকে দেখে যে কি আনন্দ হয়েছে কি বলবো।তুই এখনও সেই আগের মতই সুন্দর আছিস।ও হ্যাঁ , মাসীমার কি হয়েছে রে?তুই আমাদের পাড়ায় মাসীমার ব্লাড রিপোর্ট নিতে এসেছিলি,মাসীমা কি এদিকেই থাকেন?

--বাবা তো লেকটাউনে বাড়ি বানিয়েছিলেন , তারপর দু হাজার বারো তে বাবা মারা যাওয়ার পর মা ওই বাড়িতে একাই থাকতেন ।গত দুবছর ধরে মা খুব অসুস্থ , অ‍্যাকিউট ডায়াবেটিস এর পেশেন্ট । একা থাকা বিপদজনক ,তাই দাদা - বৌদি মা কে ওদের কাছে এনে রেখেছে। এখন ওরা মেয়ের কাছে বস্টনে গেছে তাই আমি প্রায় একমাস হল মায়ের কাছে এসে আছি,দাদারা আগামী মঙ্গলবার কলকাতায় ফিরবে,  তার আগেই তুই একদিন এখানেই চলে আয় নিরিবিলিতে দুজনে মিলে অনেক গল্প হবে। অনেক কথা তোকে বলতে ইচ্ছে করছে।

--ঠিক আছে কাল  তোর কাছে যাব,মাসীমা কেও দেখে আসা হবে,আর তোর সাথে জমিয়ে আড্ডা হবে ,তবে তুই তো আবার ব‍্যস্ত মানুষ কাল দুপুরে ফ্রী থাকবি তো?

--তুই কি করে বুঝলি আমি ব্যস্ত !

--তোর ভিসিটিং কার্ডে দেখলাম, কি যেন culinery school এর কথা লেখা আছে। আমি তো ওসবের মানেও জানিনা হা হা হা হা।

--আরে না ,না এমন কিছু না রে,সোজা ভাষায় ওটাকে বলে রান্নার ক্লাশ,সে আমি বেশীরভাগ‌ই অনলাইনে করি, মাঝে মাঝে ডেমো দিতে যাই,সে ও খুব রেয়ার।এই কাজটায় কোনো চাপ নেই বুঝলি, সময় কাটানোর জন্য এইসব করি, তাছাড়া রান্নায় আমার বরাবরই খুব আগ্ৰহ ছিল,মা এবং শাশুড়ি দুজনেই খুব ভালো রাঁধতেন ,ওঁদের কাছ থেকে প্রচুর ভালো ভালো রান্না শিখেছি,এখন সেগুলোই শেখাই আমার ক্লাশে।

-তুই প্রেসিডেন্সি থেকে এতো ভালো রেজাল্ট নিয়ে বেরিয়ে রান্না শেখাচ্ছিস ?  তোর তো কোনো কলেজে পড়ানো উচিত ছিল।

--গ্ৰ‍্যাজুয়েশনের পর  বাবার মাথায় চাপল আমাকে পাত্রস্থ করার ভুত । খুব অল্প দিনের মধ্যে আমার বিয়েটা  হয়ে গেল সুবর্ণর সঙ্গে।  শশুরবাড়িতে এসে দেখলাম শশুর মশাই খুব অসুস্থ, শাশুড়ি আর্থাইটিস​ এর রুগী । সুবর্ণর তখন ট্যুরিং জব , মাসের মধ্যে কুড়ি দিন কলকাতার বাইরে থাকতে হত ওকে  অত‌এব বুঝতেই পারছিস ,বাড়ির সম্পূর্ণ দায়িত্ব আমার উপরেই পড়লো। আমাদের বিয়ের দেড় বছরের মধ্যে শশুর মশাই মারা গেলেন আর তার  কয়েকমাসের মধ্যে আমি প্রেগনেন্ট হলাম। ব‍্যস্ সংসার করা ছাড়া অন্যকোনো ভাবনা ভাবতেই পারিনি । ছাড় এখন এসব কথা ,অনেক্ষণ ধরে একটা ফোন আসছে বুঝলি,মনে হয় কোনো ক্লায়েন্টের  কল,কাল দুপুরে চলে আয়, আমার এখানেই খাবি।
তোর এই ফোন নম্বরে হোয়াটসঅ্যাপ আছে তো?আমি তোকে অ্যাড করে দাদার বাড়ির ঠিকানা টা  তোকে পাঠিয়ে দিচ্ছি । বাড়ির কাছেই রাস্তার বাঁদিকে একটা মিষ্টির দোকান পাবি, মহামায়া সুইটস্,ওখানে এসে আমাকে এই নম্বরে একটা ফোন করিস ,আমি তোকে নিয়ে আসবো আর তারপর প্রচুর গল্প হবে বুঝলি।এখন ছাড়ি ।টা টা।

                                          ৩
আকাশ বেশ মেঘলা , গুমোট ভাবটা কালকের  থেকে আজ একটু কম । কলকাতার এই দিকটায় এখনও বেশ কিছু গাছপালা আছে , নীলা ছাতা মাথায় কিছুটা হেঁটে একটা  রিক্সা​ পেয়ে গেল। ফুটপাতের ধারে পার্কের গা ঘেঁষে বাচ্চা ছেলেটা ওর মায়ের সাথে  নিভু আঁচে ভুট্টা পুড়িয়ে ভুট্টা বিক্রি করছিল , রিক্সা ওয়ালা রিক্সা থামিয়ে দশ টাকায় একটা পোড়ানো ভুট্টা কিনলো , নীলা ও কি মনে করে দুটো কাঁচা ভুট্টা কিনে নিলো , তারপর রিক্সাওয়ালার সাথে এই অসহ্য গরম,গ্লোবাল‌ওয়ার্মিং , রোজ বিকেলে কালবৈশাখী আর বীভ‍ৎস বাজ পড়ার গল্প করতে করতে  মহামায়া সুইটসের  কাছে পৌঁছে রিক্সার ভাড়া মিটিয়ে মিষ্টির দোকানে ঢুকলো ।
এই মানুষগুলোর সঙ্গে অহেতুক গল্প জমাতে নীলার খুব ভাল লাগে।
 মিষ্টি পছন্দ করতে করতে মনে হল আভেরী বলেছিল মাসীমার ডায়াবেটিস তাই ওঁর জন্য অন‍্য কিছু নিলে ভালো হবে ।পাঁচশো গ্ৰাম মিষ্টি দ‌ই ,ছানার জিলিপি , আর ভাপা সন্দেশ নিলো। মিষ্টির দোকানের পাশেই একটা ডিপার্টমেন্টাল স্টোর থেকে মাসীমার জন্য একটা ওটসের প‍্যাকেট কিনলো।দোকান থেকে বেরিয়ে আভেরীর নির্দেশ মত একটু এগিয়েই গোলাপি রঙের বাড়ি ,ঝুল বারান্দা,খিলান কাটা জানলা দেখতে পেল , বাড়ির গেটে লেখা ৩২,'আসিয়ানা' ।
নীলা গেট খুলে ভিতরে ঢুকে  কলিং বেল বাজাতেই দোতলার জানলা খুলে পর্দা সরিয়ে আভেরী নীলাকে দেখে বললো, আরে তুই চলে এলি !আমি তো তোর ফোনের অপেক্ষা করছিলাম। আমি নীচে আসছি এক মিনিট অপেক্ষা কর।

নীলা দেখলো বাগান ভর্তি বেলিফুল ,নয়নতারা ,গেটের উপরে আর্চ করে লাগানো  সাদা আর আবির রঙের বোগনভেলিয়া  আর বাগানের  ব‍্যাড়া জুড়ে মাধবিলতা ফুল ফুটে আছে। বেলি ফুলের গন্ধ পেলেই  নীলার রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন মনে পড়ে যায় । কেমন একটা গভীর ভাললাগা আচ্ছন্ন করে নীলাকে। ঝরে পড়া কয়েক টা বেলিফুল কুড়িয়ে হাতের মুঠোয় নিয়ে গন্ধ শুঁকলো নীলা।
  আভেরী দোতলা থেকে নেমে এসে নীলাকে জড়িয়ে ধরে বললো , বাড়ি চিনতে অসূবিধা হয়নি তো ? মিষ্টির দোকানের সামনে এসে ফোন করলিনা কেন? আমি তো রেডি হয়ে তোর ফোনের অপেক্ষা করছিলাম । চল চল উপরে চল ,ইস খুব ঘেমে গেছিস রে,এই গরমে আসতে খুব কষ্ট হলো বল।

সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে আভেরী বললো , বুঝলি মা আজকাল অনেক ভুলভাল কথা বলে,মায়ের মাথাটা একেবারে গেছে , উল্টো পাল্টা কথা বললে কিছু মনে করিসনা প্লীজ।

নীলা দোতলায় পৌঁছে দেখলো বিশাল হল ঘরে দেওয়াল জুড়ে বিশাল টিভি, তাতে খুব লো ভলিউমে বাংলা সিরিয়াল চলছে, সাদা আর ইঁট রাঙা ভারী ভারী পর্দায় ঘরটা বেশ অন্ধকার , হল ঘরের একপাশে একটা ডিভানে মাসীমা চিৎ হয়ে হাঁ করে ঘুমোচ্ছেন। নীলার  মনে পড়ে গেলো সেই স্কুলবেলার কথা, টিফিনের সময় স্কুল থেকে বেরিয়ে  আভেরীদের বাড়ি চলে যেতো মাসীমার হাতে বানানো আচার খাওয়ার লোভে ।মাসীমা ওদের আসতে দেখেই কাঁচের প্লেটে করে আচার এনে বলতেন দ‍্যাখ তো খেয়ে কেমন হয়েছে , এটা এবার নতুন বানিয়েছি। তেমন সুস্বাদু আচার এরপর খেয়েছে বলে মনে ওপড়েনা নীলার।অনেকবার মাকে বলেছে আচার বানাতে, মা ও বানিয়েছে কিন্তু মাসীমার হাতের আচারের মত হয়নি।

আভেরীর বাবা উচ্চ পদস্থ সরকারী কর্মচারী ছিলেন ,চার পাঁচ জন কাজের লোক,মালী সবসময় কাজ করত ওদের বাড়িতে।ওখানেই  প্রথম আর্দালী দেখেছিলো নীলা। ওদের ওই বাড়িতে বিশাল বড়ো বাগান ছিল , বাড়ির সামনে কত রকমের ফুল আর টবে নানা রঙের অর্কিড ফুটে থাকত । মাসীমা   বলতেন গাছগুলো তোর মেসোমশাই এর সন্তানের  মত, অফিসের কাজের পর  আর ছুটির দিন গুলোয়  এই গাছের পরিচর্যা নিয়ে পড়ে থাকে । যতবার ডুয়ার্সে যায় রঙবেরঙের অর্কিড আনে, একবার তো সেগুলো এনে ডীপ ফ্রীজে ভরে রাখলো সে কি ঝামেলা আমার ।

 ওদের বাড়ির পিছনের বাগানে মরসুমী সবজি হতো , এছাড়া আম,কাঁঠাল , পেয়ারা ,কলা  আর একটা  কাজু গাছ ছিল, নীলা এখানেই​ প্রথম কাজু গাছ দেখেছিল ,তবে কাজু গুলো খুব ছোট অবস্থাতেই শুকিয়ে ঝরে যেত  ।কাজু  যে কারো বাড়িতে ফলতে পারে এই ধারণা এর আগে ছিলো না।

 হল ঘরের অন্যপ্রান্তে রান্নাঘর আর তার সাথে লাগোয়া  আট চেয়ারের বিশাল ডাইনিং টেবিল।নলিনী কথা বলতে বলতে ডাইনিং টেবিলের একটা চেয়ার টেনে বসলো।
রান্নার মাসী কাঁচের গ্লাসে জল আর প্লেটে করে দুটো সন্দেশ এনে নীলা কে বললো দিদি এইটুক খেয়ে নাও। নীলা মাসীর দিকে তাকিয়ে ধন্যবাদ সূচক হাসি দিল একটা।

আভেরী ততক্ষণে এলোমেলো ঘরটা ঠিকঠাক করতে করতে বললো , নীলা  তোর নিশ্চই এখন‌ই খিদে পায়নি ,  নীলা মাথা নাড়লো।আভেরী বললো চল দাদাদের বেডরুমে বসি, এখানে বসলে গল্প করা যাবেনা।মা জেগে গেলে মুশকিল , তখন তোকে শুধু মায়ের  সঙ্গেই  কথা বলতে হবে, না হলেই ক্ষেপে যাবে। মা একেবারে ছোট বাচ্চার মত হয়ে গেছে বুঝলি।
     
                                 ৪
আভেরীর দাদা বৌদি র বেডরুম টা খুব সুন্দর ছিমছাম সাজানো,পুরো বাড়ির ডেকোরেশনে পোড়ামাটি আর  ডোকরার ব‍্যবহার বেশি।এই ঘরের পর্দা গুলো খুব সুন্দর  , বন্ধ কাঁচের জানলা ভেদ করে বাইরের আলো পর্দায় পড়ে বৈশ একটা মায়াবী রঙ ছড়িয়ে পড়েছে সারা ঘরে। দেওয়ালের রঙের সাথে দারুণ কন্ট্রাস্ট  ! নীলা হাত দিয়ে পর্দা গুলো ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখছিলো । আভেরী বললো ,জানিস এই বাড়ির কম্পলিট ইনটেরিয়র আমার বৌদির করা । নীলা বললো,বাহ দারুন তো? তোর বৌদি কি ইন্টেরিয়র ডেকরেশন পড়েছে?  আভেরী বললো , না না, বৌদি তো প্রেসিডেন্সিতেই ছিলো  , আমারই সাব্জেক্ট ,আমার থেকে এক ইয়ার সীনিয়র ছিল।  ও এখন বিবেকানন্দ কলেজে পড়ায়।
 এই দ‍্যাখ এই হলো আমার দাদা , বৌদি আর ওদের মেয়ে , আমার পুক্কুড়ি। আর এই হলাম আমি,সুবর্ণ আর আমাদের মেয়ে মিলি , ভালো নাম ক‍্যামেলিয়া ।  এন,আই,টি দুর্গা​পুরে  পড়ে, এবার থার্ড ইয়ারে উঠবে। এখন ওর গরমের ছুটি চলছে কিন্তু ইনটার্নশিপ চলছিল , আজ শেষ হবে। কাল‌ই বাড়ি চলে আসবে। নীলা  বললো , বাঃ  ! তোর মেয়ে তো রূপে গুণে ঠিক তোর মত হয়েছে দেখছি , দারুণ দেখতে ঠিক সুস্মিতা সেনের মত। আভেরী খুব জোরে হেসে বললো  ,না রে সবাই বলে মিলি নাকি একেবারে সুবর্ণর মতো দেখতে হয়েছে  , তবে ভীষণ চঞ্চল, সুবর্ণর মত শান্ত নয়।
আভেরী বললো ,খুব ভাল তো, পিতৃমুখী কন‍্যা সুখী।

আভেরী এবার নীলাকে  বললো,শোন  তখন থেকে আমার কথাই বলে চলেছি । কালকেও ফোনে আমার কথাই বলেছি কিছুটা । দুদিন ধরে আমি অনেক বকবক করেছি , এবার তুই বল দেখি তোর কথা ।

-- আমার কথা?  কোথা থেকে শুরু করি বলতো?
হ্যাঁ শোন ,যেটা সেদিন তুই ফোনে জানতে চেয়েছিলি,সেখান থেকে শুরু করি।
উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত আমি মামাবাড়িতে থেকে পড়াশুনা করেছি তোর মনে আছে নিশ্চয়ই । আমি ক্লাস ইলেভেনে পড়াকালীন আমার মামার বিয়ে হয় ।মামার বিয়ের পর ওখানে আমার থাকা নিয়ে মামীর সাথে মামার প্রায়ই ঝামেলা হত তারপর কোনোরকমে টুয়েলভের পরীক্ষা দিয়ে আমি আমার মা বাবার কাছে বিহারে চলে যাই।ওখানেই পলিটিক্যাল সায়েন্স নিয়ে বি এ পাশ করি।  ছোটবেলা থেকে মা কে চাকরি করতে দেখেছি তাই আমার ও চাকরি করার খুব শখ ছিলো। চাকরি করবো বলে একটা টাইপ শর্টহ‍্যাণ্ড স্কুলে বাবা আমাকে ভর্তি করে দিলেন। ওখানেই আলাপ হলো শতানিক এর সাথে। ওর বোন পৃথা আমার‌ সাথে টাইপ ,শর্টহ‍্যাণ্ড শিখতো। শতানিক আমার থেকে   চার বছরের বড়ো ছিলো , স্টীল কোম্পানি তে চাকরী করতো ,খুব স্মার্ট, সুন্দর কথা বলতে পারে , দারুণ আবৃত্তি করে,নাটক করে ।কয়েকদিনের আলাপেই আমি শতানিক এর প্রেমে পড়ে গেলাম।ব‍্যস্, তারপর শুরু হলো আমাদের প্রেম পর্ব, লুকিয়ে চুরিয়ে দেখা করা, সিনেমা দেখা , চলতে লাগল ।মা বাবা দুজনেই অফিসে চলে যেতেন ,সেই সুযোগে  বেশ কয়েকবার আমি আর শতানিক একা বাড়িতে কাটিয়েছি।এরকম একদিন দুপুরে মায়ের শরীরটা  খারাপ হ‌ওয়ায় মা হঠাৎ বাড়িতে এসে  আমাদের দুজনকে দেখে । মা একটাও কথা বলেনি শুধু আমাদের দিকে প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল ।মায়ের ওই রকম চোয়াল শক্ত করা ভয়ংকর রূপ আমি কোনদিন দেখিনি। শতানিক মাথানীচু করে চুপ চাপ বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছিল সেদিন । শতানিক চলে যাবার পর  মা আমাকে শুধু জিজ্ঞেস করেছিল  যে , আমরা কি আমাদের বিয়ের​ কথা ভেবেছি? আমি বললাম এমন আলোচনা কখোনো হয়নি আমাদের মধ্যে। এরপর মা ঢকঢক করে দু গ্লাস জল খেয়ে ঘর অন্ধকার করে ফুল স্পীডে ফ‍্যান চালিয়ে শুয়ে পরেছিল বিছানায়। বাবা অফিস থেকে ফিরে আসার পর আমার সামনেই মা  বাবাকে সব জানালো ।বাবা খুব গম্ভীর হয়ে  আমাকে বললো কালকেই শতানিক কে বাড়িতে আসতে বলো, আমি কথা বলব ওর সাথে। পরদিন শতানিক এলো। আমাকে বিয়ে করার প্রস্তাব জানালো বাবাকে । বাবা বললেন খুব শিগগিরই ওর মা বাবার সাথে দেখা করবেন।দুই বাড়িতে কথা হলো। শতানিকের মা বাবার এই বিয়েতে প্রথমে  আপত্তি ছিল আমি কালো বলে ,তারপর অবশ্য ওঁরা রাজী  হয়ে গেলেন । আশীর্বাদের দিন , বিয়ের দিনক্ষণ সব  ঠিক হয়ে গেল ।  আশীর্বাদের দু দিন আগে শতানিকের বাবা এক লাখ টাকা পণ চাইলেন বাবার কাছে। আমার মা বাবার তো মাথায় হাত, সামান্য কেরানীর চাকরী করে এত টাকা কোথা থেকে জোগাড় করবেন! আমার তখন পাগলের মত অবস্থা ,বার বার শতানিক কে খবর পাঠাচ্ছি আমার সাথে কথা বলার জন্য কিন্তু ও কিছুতেই যোগাযোগ করলোনা,রাগে,দুঃখে ,অপমানে আমি বিয়ে টা ভেঙে দিলাম।
এতক্ষণ আভেরী মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনেছিলো , এবার চমকে উঠে বললো ,কি সাংঘাতিক ! সেই সময় এতবড়ো পদক্ষেপ তুই নিতে পারলি? তোকে দেখে তো একটু ও বোঝা যায় না তোর এত সাহস! তারপর কি করলি? তবে খুব ভালো করেছিস। এমন ছোটলোক ফ‍্যামিলিতে ভাগ্যিস বিয়ে করিসনি ।

-- কি আবার করবো ? মানসিক ভাবে একেবারে ভেঙ্গে পড়লাম। আমার এই মানসিক অবস্থা দেখে মা বাবা আমাকে কিছুদিন কাউন্সিলর এর কাছে কাউন্সিলিং করালেন , খুব একটা উন্নতি হলনা আমার । তারপর সাইকায়াট্রিস্ট এর কাছে ট্রিটমেন্ট করালেন।। উনিই বললেন জায়গা পরিবর্তন করার কথা । আমাকে সুস্থ করার জন্যে  মা চাকরি ছেড়ে আমাকে নিয়ে কলকাতা চলে ‌এলো। প্রায় দুবছর এখানে ভাল সাইকায়াট্রিস্টের কাছে ট্রিটমেন্ট করে যখন পুরোপুরি সুস্থ হলাম তখন ওখানেই​ এক পরিচিতের মাধ্যমে সম্বন্ধ করে পরমেশের সাথে আমার বিয়ে হয়ে গেল। বিয়ের আগে পরমেশকে  শতানিকের ব্যাপারে সব জানিয়েছি ,সব জেনে শুনেই পরমেশ এই বিয়েতে রাজি হয়। আমাদের এক মেয়ে ,এখন ব‍্যাঙ্গালোরে চাকরী করছে।

আভেরী জিজ্ঞেস করলো শতানিক মানে‌ কি রে?

নীলা হেসে বললো মহাভারত পড়,  উত্তর পেয়ে যাবি।
আভেরী দু হাত উপরে তুলে আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে  রঙ করা সোনালী চুল গুলোতে আঙ্গুল চালাতে চালাতে বললো  আমি বেশ ভালো আছি বুঝলি , জীবনের কোনো গল্প নেই আমার  অজয় নদীর মত বয়ে চলেছি সারাবছর শুকনো আর বর্ষায় বন্যা  । এই বলে হাসতে হাসতে নীলার কোলের উপর লুটিয়ে পারলো, ঠিক যেমন সেই স্কুলবেলায় হেসে গড়িয়ে পড়া স্বভাব ছিল, আজও তেমনি আছে ।নীলা  বললো তা আর বলতে হবেনা। আমি বেশ বুঝতে পারছি যে তুই খুব ভালো আছিস, আমার মত বুড়িয়ে যাসনি ।এই পঞ্চাশে এসেও তোর রূপ যৌবনে কোনো খরা তো নজরে পড়ছেনা ,বলতে বলতে দুজনে হাসতে হাসতে এসে ডাইনিং টেবিলে বসলো।

                                         
       .                              ৫
নীলার থালায় সুন্দর করে সাজানো বাটি মাপা ভাত,পটল ভাজা,ঢ‍্যাঁরস ভাজা ,আলু ভাজা,বাটিতে মুগের ডাল ,শুক্তো, ঝিঙে পোস্ত ,সর্ষে দিয়ে পাবদা মাছের ঝাল,আমের টক আর কাঁচের প্লেটে চারটে মিষ্টি  আর দই । অনেক দিন পর এমন সুন্দর করে গুছিয়ে নলিনী কে কেউ খেতে দিল। দেড় বছর হল মা মারা যাবার পর থেকে এমনটা পায়নি নলিনী । দেখলো আভেরীর থালায় এক হাতা ভাত, একটু ডাল ,অল্প শুক্তো আর একটা ছোট পাবদা মাছ। নলিনী বললো ,তুই ওই টুকু খাবি! এবার বুঝতে পেরেছি এত সুন্দর ফিগার তুই কি করে মেনটেইন করিস।আভেরী  বললো , এই দেখ আমি সকাল থেকে কি কি খাই ,বলে কামিজ টা পেটের উপরে তুলে পেটে ইনসুলিন নিল।নলিনী বললো ,ইস কি সব আজে বাজে রোগ বাঁধিয়েছিস ,আভেরী বললো , শোন ,শোন আরও আছে,ঘুম থেকে উঠে থাইরয়েডের ওষুধ , ব্রেকফাস্টের পরে হাইপারটেনশন এর ওষুধ, দুপুরে খাবার পর কোলেস্টেরল এর ওষুধ রাতে হার্টের ওষুধ আর এর সাথে তিন বেলা খাওয়ার আগে ইনসুলিন তো আছেই। এই সব নিয়ে বিন্দাস আছি বুঝলি ।
নীলা বললো , তাহলে তুই দ‌ই, মিষ্টি কিচ্ছু খাবিনা ? মাসীমার জন্য একটা ওটসের প‍্যাকেট এনেছি কিন্তু তোর জন্যে তো কিছু আনা হলনা , ভাগ্যিস ক‍্যাডবেরি আনিনি ।আভেরী বললো ছাড়তো , তুই ও পারিস ,মা'র জন্য আবার ওটস আনতে গেলি কেন পাকামো করে ? তুই যে এলি এটাই তো আমার অনেক বড়ো পাওয়া।
নীলার হঠাৎ মনে পড়লো আসার সময় দুটো ভুট্টা কিনেছিল, বললো ,আভেরী তুই ভুট্টা খাস ? আভেরী মাথা দুলিয়ে বললো ভীষণ ভালোবাসি ভুট্টা খেতে।
নীলা  বললো , আমার ব‍্যাগে দুটো ভুট্টা আছে আসার সময় কিনেছিলাম। খেয়ে উঠে , হাত ধুয়ে ব‍্যাগ থেকে বের করে তোকে দিচ্ছি দাঁড়া । রান্না গুলো দারুণ হয়েছে কিন্তু তুই কিছু খাচ্ছিস না দেখে একটুও ভালো লাগছে না।
আভেরী রান্নার মাসী কে বললো ,মাসী আমার বন্ধু তোমার রান্নার প্রশংসা করছে, নীলাও  সাথে সাথে মাসীকে বললো দারুণ রেঁধেছো মাসী ,ঝিঙে পোস্তটা ফাটাফাটি হয়েছে । মাসী খুব খুশি হয়ে বললো , তাহেলে আরাকটুন দি? নীলা বললো ,না মাসী পেটে আর জায়গা নেই, বাড়িও ফিরতে হবে,  প্রায় চারটে বাজে।
মাসী বললো তোমরা উঠে হাত মুখ ধুয়ে গল্প করো ,এঁটো তো হাতেই শুকিয়ে গেলো।
বেসিনে হাত ধুতে ধুতে আভেরী বললো তুই বললি তোর মেয়ে চাকরি করছে তোর মেয়ের বিয়ে দিবিনা ? প্লীজ তাড়াতাড়ি বিয়ে দে, আমার অনেক গুলো নতুন শাড়ী আলমারিতে পরে আছে, ভাঙা হয়নি, আজকাল দামি শাড়ি পরাই হয়না , তোর মেয়ের বিয়েতে দারুণ দারুণ শাড়ি পরবো আর হেব্বি মাঞ্জা মেরে বুড়ো গুলোর মাথা ঘুরিয়ে দেব ,হাহাহাআআ।

 নীলা  বললো তুই দুর্বার বিয়ে নিয়ে  এত প্ল‍্যান করে ফেললি আর  ওটা নিয়েই আমি  খুব অশান্তি তে আছি বুঝলি।
দুর্বা যাদবপুর থেকে ইংরেজি তে অনার্স করে জে এন ইউ  থেকে মাস কমিউনিকেশন নিয়ে মাস্টার্স করে বছর চারেক হল, একটা ভালো চাকরি করছে ব‍্যঙ্গালোরে ।
 ছোটবেলা থেকে নিবিৎ  নামে ওর‌ই ক্লাশের একটা ছেলের সাথে ওর খুব বন্ধু্ত্ব ছিল।স্কুলে দুর্বার রেজাল্ট সবসময় নিবিতের থেকে অনেক ভালো হত । হায়ার সেকেন্ডারি তে ও দুর্বা নাইন্টি  পার্সেন্ট মার্কস পায় আর নিবিৎ এইট্টি টু পার্সেন্ট এর মতো পেয়ে জয়েন্ট এন্ট্রান্স দিয়ে প্রাইভেট কলেজে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে । তারপর খুব একটা ভালো কম্পানি তে ওর প্লেসমেন্ট না হ‌ওয়ায়  চাকরি ছেড়ে ম‍্যনেজমেন্ট পড়ে।ম‍্যানেজমেন্টের রেজাল্ট খুব ভালো হয় নিবিতের।  একটা আমেরিকান ব‍্যাংকে ভালো প‍্যাকেজের চাকরি পেয়ে যায় এক বছর হলো।এখন আমরা চাইছি দুর্বা আর নিবিতের  বিয়েটা  দিয়ে দিতে। নিবিতের মা ,বাবাও তাই চাইছেন ,ওঁরা দুর্বাকে খুব ভালোবাসেন । আমরা সবাই চাইছি আগামী বছর ওদের বিয়ে হোক  কিন্তু দুর্বা হঠাৎ বেঁকে বসেছে , ওএখন নিবিতকে কিছুতেই বিয়ে করতে চাইছেনা কারণ নিবিতের মাইনে ওর মাইনের থেকে অনেক বেশী। এই নিয়ে আমাদের সঙ্গে দুর্বার খুব ঝামেলা চলছে। আমি আর ওর বাবা চাইছি ব‍্যাঙ্গালোরে গিয়ে সামনাসামনি ওকে বুঝিয়ে আসি কিন্তু আমাদের কিছুতেই যেতে দিচ্ছে না ও।
পনেরো দিন হয়ে গেল আমাদের সাথে কথা বলেনা মেয়ে, আমরা ফোন​ করলে ফোন কেটে দেয়। অপারক হয়ে নিবিৎকে ফোন করি, নিবিৎ জানায় যে ওদের দুজনের মধ্যে কথা কাটাকাটি ,ঝগড়া রোজ হচ্ছে। এই  তোর এখানে আসাবো বলে যখন রেডি হচ্ছি তখন নিবিৎ  আমাকে ফোন করে জানালো কাল রাতে দুর্বা ওকে ফোনে বলেছে ওদের এই বিয়েটা হবেনা কারণ দুর্বার এ বিয়েতে আপত্তি আছে।
নিবিতের ফোন টা পেয়ে আমি খুব একটা আশ্চর্য হইনি জানিস ,আমার মনে হয়েছিল এমনই একটা কিছু ঘটতে চলেছে।
তবে দুর্বার এই সিদ্ধান্ত নিবিতের কাছ থেকে শুনে মুহুর্তের মধ‍্যে তিরিশ বছর আগের ছবি ভেসে উঠলো আমার চোখের সামনে । আমিও একদিন আমার বিয়ে ভাঙার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম আর আজ আমার মেয়েও নিজের বিয়ে ভাঙার সিদ্ধান্ত  নিল অথচ দুটোর মধ্যে কতখানি তফাৎ!
আমি মনে হয় দুর্বাকে ভালো ভাবে মানুষ করতে পারিনি বুঝলি। মাইনের ফারাকের জন্য কেউ বিয়ে ভেঙে দিতে পারে ,এটা আমি ওর মা হয়ে বিশ্বাস করতে পারছিনা।

   নীলার চোখ মুছিয়ে দিতে দিতে আভেরী জানলার পর্দা সরিয়ে নীলাকে বললো, আরে দ‍্যাখ ,দ‍্যাখ বাইরে তাকা ,কি রোমান্টিক ওয়েদার ! বৃষ্টি শুরু হয়েছে ,চল চল দুজনে মিলে বৃষ্টিতে  ভিজি, কতদিন বৃষ্টিতে ভিজিনি।

"এমন দিনে তারে বলা যায় ,এমন‌ও ঘনঘোর বরিষায়---- "
    নীলার উদাত্ত কণ্ঠ  মিলে মিশেএকাকার হয়ে যেতে লাগলো শেষ বিকেলের বৃষ্টিতে ।



Wednesday, April 11, 2018

চৈতালি দাস

নীপবিথি

চৈতালি দাস


প্রতিদিনের মত আজও ঠিক সন্ধে সাতটায় শুভ্রর ফোনটা এলো । গত দু - মাস হল এই ফোনটার অপেক্ষায় থাকে গার্গী ‌।সাতটা বাজার আগে থেকেই মোবাইলটা নাড়া চাড়া করে । কখন ও কখন ও আবার  মনে হয় মোবাইল এর রিংটোন টা মিউট করা আছে হয়তো  ,শুভ্রর ফোন বেজে গেছে শুনতে পায়নি । তারপর হাতের মুঠোয় ধরা মোবাইলটা ভালো করে দেখে বোঝে যে এসবই তার মনের ভুল । মোবাইল এর সাউণ্ড একেবারে ম‍্যক্সিমামে  দেওয়া  আছে।

--হ‍্যাঁ , হ‍্যালো শুভ্র বলো বলো ।

-- কাল তো  তোমাদের ওদিকে ভয়ানক ঝড় - বৃষ্টি  হয়েছে দেখলাম । তোমরা ঠিক আছো তো? সকালে নিউজে খবরটা দেখতে দেখতে ভাবলাম অফিসে পৌঁছেই  তোমাকে একটা ফোন করবো কিন্তু অফিসে ঢোকার পর থেকে একটার পর একটা এমন কাজে ফেঁসে গেছি যে ফোন করতে পারিনি, এই জাস্ট পাঁচ মিনিট আগে মিটিং শেষ করে নীচে নেমে সিগারেটটা ধরিয়ে তোমাকে ফোন টা লাগালাম।

-হ‍্যাঁ শুভ্র কাল ঝড়ের এই তাণ্ডবে সারা কলকাতা তছনছ হয়ে গেছে , টিভি তে বলছিল ঝড়টা নাকি প্রায় একশো কিলোমিটার বেগে চলেছিল। আমার তো ভয় করছিলো যে সত্তর বছরের পুরোনো এই বাড়ি না ভেঙে পড়ে ‌। পুরো বাড়িটা কাঁপছিল ঝড়ের দাপটে । আমাদের বাগানে  একটা  আমগাছ ও পড়েছে ,তবে গাছটা বেশী বড়ো নয় বলে তেমন কিছু ক্ষতি হয়নি ।

- যাক, নিশ্চিন্ত হলাম ,তোমাদের তেমন কোনো ড‍্যামেজ হয়নি জেনে। শুনলাম মোট পনেরো জন মারা গেছে এই ঝড়ে , সাংঘাতিক ডিভাস্টেটিং !

-- শুভ্র, ঝড়ের টপিক বাদ দাও এবার। সকাল থেকে এক কথা চলছে ,অন্য কিছু বলো ।কালকের যে গল্পটা মাঝপথে ছেড়ে চলে গেছিলে ওটা কন্টিনিউ করো। 

--ওহ্ ,কোনটা বলছিলাম যেন ? মনে করতে পারছিনা ,একটু ধরিয়ে দাও প্লিজ।

-- তোমাদের পাড়ার প্রভাত ফেরীর গল্পটা বলতে  শুরু করেছিলে কাল।

- হ‍্যাঁ হ‍্যাঁ , বলি শোনো । তখন আমি এইট কিংবা নাইনে পড়ি ।বাবা একদিন সন্ধেবেলায় বললেন কাল সকাল থেকে পাড়ায় প্রভাত ফেরি হবে ,অরুণ কাকার বাড়ির সামনে ঠিক ভোর সাড়ে চারটেয় আমাদের সকলকে পৌঁছে যেতে হবে। 
 বাবার এই কথায় মনে মনে রাগ হলো বেশ ,সবে দুদিন হলো গরমের ছুটি পড়েছে  ,কোথায় নাক ডেকে ঘুমোবো ? তা না ভোর সাড়ে চারটেয় প্রভাতফেরি। তবে বাবার কথা অমান্য করার সাহস কিংবা শিক্ষা কোনোটাই আমাদের ছিলনা। 
পরদিন ভোর চারটেয় বাবা ঘুম থেকে ডেকে দিলেন।ঘুম -চোখ কচলাতে কচলাতে অরুণ কাকার বাড়ির সামনে এসে দেখি পাড়ার অনেক মানুষ জড়ো হয়েছে।
শুরু হলো প্রভাতফেরি । অত সকালে হালকা হালকা ঠাণ্ডা হাওয়া দিচ্ছিল । ভোরের সূর্যের সেই কোমল স্পর্শ আজ ও ভুলিনি জানো।

-- প্রভাতফেরিতে কি কি গান গাইতে তোমরা?

-- হুমম মূলত ব্রতচারির গান গাওয়া হত ।এখনো মনে পড়ে "হও ধর্মেতে ধীর  ,হও কর্মেতে বীর ,হও উন্নত শির নাহি ভয়" গাইতে গাইতে টানটান হয়ে যেত শিরদাঁড়া  ।সারাশরীরে যে গরম রক্ত খেলছে তা বেশ টের পেতাম ওই ভোরবেলাকার গা শিরশির করা হাওয়ায় । চার -পাঁচদিনের মধ্যেই ভোর বেলাকার প্রভাতফেরি বেশ ভালো লাগতে শুরু করলো। এরকমই একদিন প্রভাতফেরীর শেষে অরুণ কাকা আমাদের সকলকে বললেন , "কাল প্রভাতফেরীর শেষে স্টেশনের দিকের বড়ো মাঠে বক্তৃতা দিতে আসবেন বিশিষ্ট অভিনেতা সমরেন্দ্র বাগচি ,কেউ যেন প্রভাতফেরী শেষে বাড়ি না যায় , সমরেন্দ্র বাবুর বক্তৃতার পর জলখাবারের প‍্যাকেট দেওয়া হবে সক্কলকে।"

এতক্ষণ গার্গী শুধু শুনেই চলেছিল শুভ্রর গল্প, যেমন রোজ শোনে । ভালোলাগে শুনতে ,মনে হয় চোখের সামনে গল্পের প্রতিটা চরিত্রকে দেখতে পাচ্ছে। শুভ্র আবার গল্প বলতে বলতে গুনগুন করে গান গেয়ে ওঠে,এই যেমন আজ ও প্রভাতফেরীর গল্প বলতে বলতে গেয়ে উঠলো ,হও ধর্মেতে ধীর।গার্গী বলে শুভ্রর গলায় গানের মধ্যে একটা গভীর বেদনা আছে ,অনেকটা জগজিতের মত ।এই কথাটা শুনলে শুভ্র লজ্জা পেয়ে বলে, "আরে ,আমি কি আর গাইয়ে? আমি হলাম গিয়ে বাজিয়ে"।
সমরেন্দ্র বাগচির প্রসঙ্গ উঠতেই গার্গী খুব উৎসুক হয়ে বললো- আরে সেই সময় সমরেন্দ্র তো মারাত্মক হ‍্যাণ্ডসাম হিরো,প্রায়  সব মেয়েদেরই আরাধ্য পুরুষ ছিল।ওর  গলার আওয়াজ,তাকানো ,হাসি, সব  ছিল পাগল করা । আমি ওঁর ভয়ঙ্কর ফ‍্যান ছিলাম ,টিউশন ফাঁকি দিয়ে পাড়ার রত্না বউদির সঙ্গে সব কটা সিনেমা দেখতাম। 
বলো ,বলো  সমরেন্দ্রকে কেমন দেখলে ? 

গার্গীর এত উৎসাহ ,উচ্ছ্বাস  দেখে শুভ্র কেমন মিইয়ে গিয়ে বললো শোনো তাহলে।

- সমরেন্দ্র আসার খবরটা আমাদের গড়িয়া অঞ্চল জুড়ে ভালোই ছড়িয়েছিল । খেলার মাঠ উপচে পড়েছিল ভীড়ে। সেখানে প্রচুর গরীব গুর্বোও এসেছিল কোলে কাঁখে বাচ্চা কাচ্চা নিয়ে। সমরেন্দ্রর গুরু গম্ভীর ভাষণ ওই মানুষগুলো যে কিছুই বুঝতে পারছেনা অরুণ কাকা তা বুঝতে পেরে সমরেন্দ্রকে অনুরোধ করলেন ওদের জন্য দু-চার লাইন কিছু বলতে ,অন্তত একটা ছোট্ট কবিতা যেন ওদের জন্য তিনি শোনান। অরুণ কাকার কয়েকবার অনুরোধ সত্ত্বেও সেদিন সমরেন্দ্র বাগচী  ওদের জন্যে একলাইনও  কিছু বলেননি।সেদিন খুব অবাক হয়েছিলাম জানো! এত বড়ো অভিনতা ওদের উদ্দেশ্যে কিছুই বলতে পারলেননা? এই না বলার কারণ টা তখন বুঝতে পারিনি ছোট ছিলাম বলে।বড়ো হয়ে বুঝতে পেরেছি যে অনেক বড়ো মানুষের মধ্যে অনেক ছোট মন থাকে ,যা চাকচিক্যের আড়ালে ঢাকা থাকে ,কখনো সখনো বেরিয়ে পড়ে সার্টের নীচে গেঞ্জির মতো। হা-হা-হা -হা গার্গী,বুঝতে পারছো?
 বলতে বলতে মোবাইলে টাইমটা দেখে শুভ্র আঁতকে উঠে বললো - আরেব্বাবা অনেক বকবক করে ফেলেছি ।বাজার করে বাড়ি ফিরতে হবে  । ইস্ অনেক দেরী হয়ে গেল।

--এতরাতে আর কিছু সবজী পাবে?

---হ‍্যাঁ ,হ‍্যাঁ এখানে অনেক রাত পর্যন্ত সবকিছু পাওয়া যায় বাজারে, এ হলো দিল্লী বুঝলে।

 --এখন রাখি ।কাল সন্ধে সাতটায় কথা হবে।টা টা।

দিনে দিনে শুভ্রর গল্পশোনার লোভটা গার্গীর বেড়েই চলেছে। একথা সেকথা বলতে বলতে শুভ্রকে খুঁচিয়ে দিয়ে একটা না একটা গল্প আদায় করেই ছাড়ে । শুভ্রর সঙ্গে ফেসবুকেই এই বন্ধুত্ব ।গার্গীর প্রথম থেকেই মনে হয়েছে শুভ্র আলতু ফালতু লোক নয় ।যেকোনো বিষয়েই শুভ্রর আগ্ৰহ আছে ,যে বিষয় ওর জানা সেই বিষয়ে কথা উঠলে বেশ জোর গলায় আলোচনা করে  আর যেটা জানেনা সেটা অকপটে স্বীকার করে যে এটা ওর অজানা। শুভ্রর এই গুনটা গার্গীর খুব পছন্দ ।ওদের দুজনের এই বন্ধুত্বটাকে  একটা ট্রান্সপারেন্ট ছিমছাম ভার্চুয়াল  ফ্রেণ্ড আখ্যা দেয় ওরা।  গার্গী থাকে কলকাতায় আর শুভ্র দিল্লীতে । দুজনে কেউ কাউকে দেখেনি এবং একে অপরকে দেখার আগ্ৰহও প্রকাশ করেনি এই দুমাসে। যেটুকু ফেসবুক কিংবা হোয়াটসঅ্যাপের ছবিতে দেখা ,  ব‍্যস ওই পর্যন্তই। এখন এই চুয়ান্ন ,পঞ্চান্ন বছর বয়সে চোখে দেখার চেয়ে মনের আদান প্রদান এবং একটা সুন্দর বন্ধুত্বই ওদের দুজনের কাছেই অনেক বেশী কাম্য ।

সন্ধে সাতটা বাজার আগে থেকেই গার্গীর ভিতরে একটা উত্তেজনা শুরু  হয়ে যায়, সেই সঙ্গে  মোবাইল নাড়াচাড়াটাও বেড়ে যায় ।গার্গী নিজেকে বোঝায় যে শুভ্রর ফোন ঠিক সময় মত আসবেই তাও কিছূতেই স্থির থাকতে পারেনা ।গার্গী খেয়াল করে দিন দিন  ওর এই ধীর -স্থির  নির্লিপ্ত মনটা কেমন যেন চঞ্চল আর অবুঝ হয়ে যাচ্ছে। গার্গী মনে মনে হাসে আর ভাবে এই হলো বয়সের ভিমরতি।

--হ‍্যাঁ ,হ‍্যালো ,বলো ,শুনতে পাচ্ছো? হ‍্যালো ,হ‍্যালো --

-হুঁ ,তুমি যেখানে আছ সেখানে সিগনাল পুওর , কথা কেটে কেটে যাচ্ছে।

-- দাঁড়াও দাঁড়াও এক মিনিট অপেক্ষা করো, হ‍্যাঁ এবার শুনতে পাচ্ছো?

--হ‍্যাঁ এবার একদম ক্লিয়ার ,পরিষ্কার শুনতে পাচ্ছি। আজ এখানে মনে হচ্ছে বৃষ্টি আসবে , খুব মেঘ করেছে আর হাওয়াও দিচ্ছে।

- ও তোমার ওখানেও মেঘ করেছে ? এখানেও মেঘ করেছে ঝড় উঠবে মনে হচ্ছে । বাব্বা পরশু যা হয়ে গেল সেরকম তুমুল  ঝড় হলে তো সর্বনাশ। ভয় করে বাড়িটা না ভেঙে পড়ে মাথায়।

-- আচ্ছা, রোজ রোজ বাড়ি ভেঙে পড়ার কথা বলছো ,বাড়িটার যখন এতই দুরবস্থা তখন রিপিয়ার করাচ্ছোনা কেন ? সত্যি তো ,এত আনসেফ কন্ডিশনে ওই বাড়িতে থাকার কোনো মানে আছে? 

-- হ‍্যাঁ শুভ্র তুমি ঠিক বলেছো ,এই বাড়িতে থাকলে যেকোনো বড়োসড়ো দুর্ঘটনার কবলে পড়বো ,কিন্তু আপাতত এই ভাবে থাকা ছাড়া কোনো উপায় নেই ।সে অনেক কথা , এখন ওইসব শুরু করলে আমাদের গল্পের সান্ধসেশন টা খারাপ হয়ে যাবে।

--- গার্গী, এখানে ধুলোর ঝড় উঠলো তার সঙ্গে টিপ টিপ করে বৃষ্টিও শুরু হয়েছে ।দাঁড়াও গাড়িতে  গিয়ে বসি। দিল্লীতে এই এক মুশকিল বৃষ্টি আসার আগের এই ধুলোর ঝড়টা উঠলে কালো মেঘের ইম্প‍্যাক্টটাই নষ্ট হয়ে যায়।

--ওটাকে তো আঁধি বলে ,তাই না?

-হ‍্যাঁ ,খানিকটা । আচ্ছা গার্গী তুমি ওই গানটা জানো?

-কোনটা?

-ছায়া ঘনাইছে বনে বনে?

-হ‍্যাঁ শিখেছিলাম ।

-একটু গাও তো।

---শুভ্র ,প্রায় তিরিশ বছর আগে গান ছেড়ে দিয়েছি ,এখন গানের কথাগুলো মনে নেই ,সুরটা মনে আছে। 
হঠাৎ এই গান?

-আরে ,তুমি দুলাইন গাও না ।

বলতে বলতে শুভ্র নিজেই গেয়ে উঠলো ,"কবে নব ঘন বরিষণে গোপনে গোপনে এলি কেয়া----" । গার্গী গাইতে গিয়েও থেমে গেল, শুভ্রর গলায় গানটা অপূর্ব শোনাচ্ছিল ,জানলার পর্দা সরিয়ে দেখলো কালো মেঘে আকাশ ছেয়ে আছে , বৃষ্টি আসবে খুব জোরে , জানলাগুলো বন্ধ করতে ইচ্ছে করলোনা ,মনে হল আজ সবকিছু ভিজে যাক। ওদিকে শুভ্র গান থামিয়ে কিছু বলে চলেছে-

-রবি ঠাকুর কি সব সৃষ্টি করে গেছেন বলোতো ! এই সব গান সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ আধুনিক গান বলে আমার মনে হয়।

- হ‍্যাঁ শুভ্র, আমি তো এই গানকে আঁকড়ে ধরেই বেঁচে আছি।তবে আজ হঠাৎতোমার  এই গানটা কেন মনে পড়লো বলো তো?

- হুম, বহুদিন পর আজ এই গানটা মনে পড়ে গেল।
শোনো তাহলে একটা মজার গল্প বলি।

গার্গী বুঝতে পেরেছিল ওই গানের পিছনে নিশ্চই কোনো গল্প আছে শুভ্রর । এই দুমাসে শুভ্রর  এই ছোটখাটো ব‍্যাপার গুলো গার্গী আঁচ করতে পারে। সখ‍্যতার সঙ্গে সঙ্গে বোঝাপড়াটাও গভীর হচ্ছিল দুজনের মধ্যে। এই সময় শুভ্রকে একটু উসকে দিলেই যে আজ সন্ধের গল্প -সেশনটা জমে যাবে তা গার্গী খুব ভালোই জানে আর হলও তাই, শুভ্র গল্প করলো।

- --আমি যে বরাবরের গান পাগল তা আমার সব বন্ধুরা জানতো তাই কেউ কোথাও গানের আসরের খবর পেলেই আমাকে জানাত।এরকম একদিন চন্দন বললো শুভ্র আজ আমাদের পাড়ায় যাবি ?আমাদের বাড়ির কাছেই একজন গানের মাস্টারমশাই থাকেন। তিনি নিজের বাড়িতেই রবীন্দ্রসঙ্গীত শেখান । আমি আসা যাওয়ার পথে গানের ক্লাস চলাকালীন যখনই গানগুলো শুনি তোর কথা মনে হয় ,ভাবি তুই শুনলে খুব খুশী হবি। চল ,এখন যাবি ? আজ শনিবার অনেক রাত পর্যন্ত মাস্টারমশাইএর গানের ক্লাস চলে।

---তুমি নিশ্চই তোমার বন্ধুর সঙ্গে চললে গান শুনতে?

--- সে তো তুমি জানোই আমার গান শোনার পাগলামি । হ‍্যাঁ , মনে আছে , সেদিন আকাশ মেঘলা ছিল ,মনে হচ্ছিল মুষলধারে বৃষ্টি আসবে কিন্তু চন্দনের কথা শুনে মনে হলো  এই সুযোগ ছাড়লে মিস্ করবো, তার উপর আবার রবিঠাকুরের গান । ঝড় -বৃষ্টি যাই হোক না কেন যেতেই হবে মাস্টারমশাইয়ের গানের ক্লাসে। বিকাশ ও ছিল আমাদের সঙ্গে ওকেও সঙ্গে নিলাম।

-তারপর ?

-চন্দনদের সঙ্গে মাষ্টারমশাইয়ের  ভালো হৃদ‍্যতা ছিল। চন্দনকে দরজার সামনে দাঁড়াতে দেখেই উনি বললেন,"আয় ,আয় ভিতরে এসে বোস্ ।এই গানটা শেষ হলে কথা বলছি । আমরা তিনজন ক্লাস ঘরে ঢুকলাম,ঢুকেই দেখি ঘর ভর্তি মেয়ে আর একজন কি দুজন মাত্র ছেলে ।অতগুলো মেয়েকে দেখে আমি তো জড়োসড়ো হয়ে গেলাম ,তবে আমার উদ্দেশ্যতো গান শোনা অত‌এব জড়তা সহকারেই মাষ্টারমশাইএর বাঁদিকের ফাঁকা জায়গাটায় সতরঞ্চির উপর মাথানীচু করে বসে পড়লাম । পাশে বিকাশ আর চন্দন ও বসলো। সামনে গোল , মানে ঠিক হাফ সার্কেল করে সব মেয়েরা বসে আছে  তিন-চার হাত দুরত্বে ।
  
-মেয়েদের দেখে এত লজ্জা পেতে তুমি? 

-আসলে আমি বরাবর বয়েজ স্কুলে পড়েছি ,তারপর তখন সদ্য সদ্য  ইঞ্জিনিয়ার়িং  কলেজে ঢুকেছি ,সেখানেও  মেকানিক‍্যালে খুব কম মেয়ে ছিল তাই মেয়েদের কাছে জড়তাটা তখনো কাটিয়ে উঠতে পারিনি।

-  ক্লাসে কি গান শেখানো চলছিল সেদিন?

-না, কোনো পার্টিকুলার একটা  গান শেখানো হচ্ছিলনা । রবীন্দ্রজয়ন্তীর অনুষ্ঠানের রিহার্সাল চলছিল । যদ্দুর মনে পড়ছে ঋতুরঙ্গের রিহার্সাল চলছিল।

-- ইস সামনে এতগুলো মেয়ে বসেছিল ,কাউকে পছন্দ হলোনা তোমার?ভীষণ  বেরসিক ছিলে তো তুমি?

--গার্গী ,আগে পুরো গল্পটা আগে শোনো ,তারপর কনক্লুশনে এসো।

--আচ্ছা বাবা সরি, চুপ করলাম ,বলো এবার।

--মাস্টারমশাই এবার একটি মেয়েকে ইশারা করে বললেন এবার তোমার গানটা গাও। মেয়েটি গান ধরলো "ছায়া ঘনাইছে বনে বনে----"  আমি সেই গান শুনে চমকে উঠলাম ,এর আগে রবি ঠাকুরের কত গান শুনেছি কোনো গান আমাকে এইভাবে আকৃষ্ট করেনি। মেয়েটি গেয়ে চলেছে ,"যে মধু হৃদয়ে ছিল মাখা,কাঁটাতে কিভয়ে দিলি ঢাকা,বুঝি এলি যার অভিসারে ,মনে মনে দেখা হল তারে ,আড়ালে আড়ালে দেয়া নেয়া------"
আমার সব জড়তা কাটিয়ে আমি তখন মেয়েটির দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছি।শ‍্যামলা গায়ের রঙ, লম্বা বিনুনি ,হলুদ তাঁতৈর শাড়ি -এ সব কিছুই গানের মতই সুন্দর হয়ে আমার মনে ধরা দিচ্ছিল ধীরে ধীরে।

-- তারমানে তুমি প্রেমে পড়ে গেলে ওর গান শুনে?

--হ‍্যাঁ গার্গী তাই ,আমার ওই আঠারো-উনিশ বছর বয়সে এর আগে এমন করে কোনো মেয়ে আমাকে মুগ্ধ করেনি।সত্যি সত্যি প্রেমে পড়ে গেলাম ওর গান শুনে।

-- এ তো দারুণ ব‍্যাপার ,তা সেই সৌভাগ্যবতীর নাম কি শুনি।

--নীপবিথি।

-বাহ্,সুন্দর নামতো!

--ধুর, নাম জিজ্ঞেস করেছি নাকি, এই নামটা আমিই রেখেছিলাম মনে মনে ।সেদিন গান চলতে চলতে এমন বৃষ্টি এলো যে সব হুড়োহুড়ি করে যে যার বাড়ি চলে গেল। তাছাড়া কথা বলার সুযোগ পেলেও হয়তো বলতে পারতামনা। আমি তখন ওর গান শুনে টোটালি হিপ্নোটাইজড্ ,বাকরূদ্ধ।

- -উফ্ ,তুমি এত রোমান্টিক ছিলে ভাবা যায়না ।তারপর আর খোঁজ করলেনা ওর?

---চন্দনকে বললাম যে ওর গান আমার খুব ভালো লেগেছে আর একদিন চল গানের ক্লাসে।চন্দন আর বিকাশ আমার এমন পিছনে লাগলো যে আর যাওয়াই হলনা।

--আর একবার চেষ্টা করলে তো পারতে ।
--- ওটা বোধহয় আমার ভাগ্যেই ছিলনা বুঝলে।এইঘটনার ঠিক একবছর পর নীপবিথির খোঁজে গিয়েছিলাম মাস্টারমশাইয়ের গানের স্কুলে কিন্তু নীপবিথিকে খুঁজে পাইনি।কাউকে জিজ্ঞেস করতেও পারিনি ওর কথা।আমার লাজুক স্বভাব এর জন্যে দায়ী।

-- ইস্ ,এত সুন্দর একটা লাভ স্টোরি শুরুতেই শেষ করে দিলে? আচ্ছা গানের স্কুলটা ঠিক কোথায় ছিল ?

--ওটা নাকতলায় । বান্টি সিনেমা আর পেট্রোল পাম্পের মাঝের গলিটায় ঢুকে একশো মিটার মত এগিয়ে ঠিক ডানহাতে বাড়িটা।

-মাস্টারমশাইএর কি নাম ছিল বলোতো?

--মণিশঙ্কর বন্দোপাধ‍্যায় ,চন্দন মণিকাকা বলে ডাকতো।

--তারপরের গান ছিল ,"এসো নীপবনে ছায়াবীথিতলে এসো করো স্নান নবধারাজলে---"

--হ‍্যাঁ গার্গী ,একদম ঠিক ধরেছো ,ঠিক ওই গানটাই গেয়েছিল সেদিন নীপবীথি এবং সেদিন ওই গানটা আমি প্রথম শুনেছিলাম,এর আগে এই গান কখনো শুনিনি মনে আছে । গানটার কি ব‍্যপ্তি!  মন্দ্র সপ্তক থেকে তার সপ্তক পর্যন্ত চমৎকার বিস্তার  আর তেমন অবলীলায় গেয়ে চলেছিল নীপবিথি,"দাও আকুলিয়া ঘনকালো কেশ ,পরো দেহঘেরি মেঘনীলবেশ কাজলনয়নে----"
কিন্তু গার্গী তুমি কিকরে জানলে সেদিনের এই গানের কথা!

সান্ধসেশনের মাহেন্দ্রক্ষণে গার্গী  উদাত্ত গলায় গেয়ে চলেছে ,"এসো নীপবনে ছায়াবিথিতলে এসো করো স্নান নবধারাজলে---আজি ক্ষণে ক্ষণে হাসিখানি সখী অধরের নয়নে উঠুক চমকি----"।

শুভ্র গাড়ির সীটে বসেই ল‍্যাপটপটা অন করলো--কাল সকালের ফার্স্ট ফ্লাইটে কলকাতার একটা টিকিট খুব জরুরী।

Facebook Comments