html

Showing posts with label প্রিয়দর্শী দত্ত. Show all posts
Showing posts with label প্রিয়দর্শী দত্ত. Show all posts

Friday, November 16, 2018

প্রিয়দর্শী দত্ত

স্বদেশচিন্তায়ে রবীন্দ্রনাথ

প্রিয়দর্শী দত্ত



ঠিক যে বছর রবীন্দ্রনাথের জন্ম হয় অর্থাত ১৮৬১ ক্রিস্টাব্দে ভারতীয়রা প্রথম আইন সভা বা লেজিসলেটিভ কাউন্সিলগুলি তে প্রবেশ করার অধিকার পায়| তাঁর ঠাকুরদা প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর (১৭৯৪-১৮৪৬) তো চাইতেন খোদ ইংল্যান্ডের পার্লামেন্টে ভারতীয়দের প্রতিনিধিত্ব হউক| কিন্তু এ বিষয় উইলিয়াম গ্ল্যাডস্টোনের সঙ্গে তার আলোচনা নিষ্ফল হয়| পিতা দ্বারকানাথ ঠাকুর (১৮১৮-১৯০৫)ছিলেন সম্পুর্ন ভিন্ন প্রকৃতির মানুষ | যৌবনের উন্মেষই উপনিষদের দর্শনের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তৈরী করেন তত্ত্ববোধিনী সভা| পরবর্তী কালে সভা মৃতপ্রায় ব্রাহ্মসমাজে বিলীন হয়ে তাকে সঞ্জীবিত করে। রবীন্দ্রনাথের উপর তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রভাব ছিল যেমন ভারতীয় সংস্কৃতির উপর হিমালয়ের|  কেবল একবারই ২৯ জুলাই, ১৮৫৩ ক্রিস্টাব্দে কলকাতার টাউন হলের জন সভায়ে তাকে ভারতে রাজনৈতিক সংস্কারের কথা বলতে শোনা গিয়েছিল|

উনিশ শতকের বাংলায়ে যে রাজনৈতিক সচেতনাতার আবহ দেখা গিয়েছিল কি এক কারণে বাংলার তিন মনীষী বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ ও স্বামী বিবেকানন্দ তার থেকে দুরে থাকেন| কিন্তু এই ত্রয়ীকে না পড়লে ভারতবর্ষের মূল স্বরূপ ই অধরা থেকে যায়| বঙ্কিমচন্দ্র ইতিহাস চেতনার স্রষ্টা, ও দেশ কে প্রথম দেশমাতৃকা রূপে প্রতিষ্ঠিত করেন| স্বামী বিবেকানন্দ হিন্দুজাতির গৌরববোধ জাগিয়ে ছিলেন ও ভারতবর্ষ কে রাজনৈতিক নয় আধ্যাত্মিক দৃষ্টি দিয়ে দেখেছিলেন| রবীন্দ্রনাথের কাছে স্বদেশ ভারতের চিরন্তন ভাবনা, জীবন মূল্য আর জীবন শৈলীর মুর্ত্য রূপ| এই ত্রিমূর্তি প্রতক্ষ্য ভাবে ভারতের স্বাধীনতার কথা বললেনি| বঙ্কিম চন্দ্র ও বিবেকানন্দের যুগে সে দাবি ওঠেই নি| কিন্তু রবীন্দ্রনাথের দীর্ঘ জীবনকালে সে দাবি পরিনত| অরবিন্দ, গান্ধী, নেহেরু, সুভাষচন্দ্র অনেকের সাথেই তার সুসম্পর্ক ছিল| কিন্তু রবীন্দ্রনাথ গেয়েছেন মুক্তির গান, দিয়েছিলেন আপনার সাধনা দ্বারা দেশ কে স্বদেশ করে তোলার বার্তা| যে সময় ভারতের জাতীয় আন্দোলন নদী আপন বেগে পাগল পারা সেই সময় রবীন্দ্রনাথ যেন স্বব্ধ চাঁপার তরু গন্ধে ভরা|‘আমি সদা অচল থাকি, গভীর চলা গোপন রাখি’ অথবা ‘আমার চলা যায়না বলা- আলোর পানে প্রানের চলা’|

রবীন্দ্রনাথের সার্বজনিক জীবন শুরু হয়েছিল এক জাতীয়তাবাদী মঞ্চে- হিন্দু মেলা| এই বাত্সরিক মেলার প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন ব্যায়ামবীর নবগোপাল মিত্র ও পৃষ্ঠপোষক ছিল জোড়াসাঁকোর ঠাকুরপরিবার| মেলা আয়োজিত হয়েছিল পর পর নয় বছর – ১৮৬৭ থেকে ১৮৭৬| এখানেই ১৮৭৫ ক্রিস্টাব্দে ১৪ বত্সরের কিশোর   রবীন্দ্রনাথ জনসমক্ষে তাঁর প্রথম কবিতা পাঠ করেন – হিন্দু মেলার উপহার| কয়েকদিন পরেই এই কবিতাটি অমৃতবাজার পাত্রিকায়ে প্রকাশিত হয়|

হিন্দু মেলার মাধ্যমেই বাংলায়ে দেশাত্মবোধক গানের সূত্রপাত হয়| রবীন্দ্রনাথের বড়দা ও ভারতের প্রথম ICS অফিসার সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন –“মিলে সব ভারত সন্তান/এক তান মন প্রাণ/ গাও ভারতের যশোগান” ইত্যাদি| হিন্দু মেলা দীর্ঘজীবি হয় নি কিন্তু পরবর্তী কালে বাংলায় জাতীয়বাদী আন্দোলনের মানস ভিত্তিভূমি রচনা করে|

উনিশ শতকের শেষ প্রান্তে রবীন্দ্রনাথ মধ্য যৌবনে| এক দিকে প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান, ইতিহাস চর্চা, বঙ্কিমের সাহিত্য, অন্যদিকে স্বামী বিবেকানন্দের বিশ্বমঞ্চে উদয়, তার সিংহল বক্তৃতা ভারতে হিন্দু গৌরবের ঘোষনা করছে| কবি এই দশকে লেখেন ‘কথা ও কাহিনী’| গৌতম বুদ্ধ, শিবাজি, তাঁর গুরু সমর্থ রামদাস, শিখ গুরু গোবিন্দ সিংহ, তরু সিংহ, বন্দা বাহাদুর ইত্যাদি অনেকের বৃতান্ত এতে স্থান পেয়েছে| অনেকে রবীন্দ্রনাথ যে হিন্দু জাতীয়তাবাদের সমর্থক ছিলেন তা প্রমান করতে এই সব কবিতার উদ্ধৃতি দেন| অন্যরা তাঁকে বিশ্বমানব, মহামিলনের প্রতীক ইত্যাদি বলেন| সম্যক ভাবে রবীন্দ্রনাথের চিন্তার গভীরতা মাপতে আমরা এখনো অসমর্থ|

রবীন্দ্রনাথের মধ্যে যে ভারতবোধ মজ্জাগত ছিল তা ইতিহাস বা রাজনীতি নয় কৃষ্টি| তাতে ছাতিমের শীতল গন্ধের মত উপনিষদ, রামায়ন, মহাভারত ও কালিদাসের কাব্যের নির্যাস ছিল| ইতিহাসের ঘটনাবহুলতা রাজনীতির কচকচানির মত তাকে তাকে ক্লান্ত করত| কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ভারতের তত্কালীন রাজনৈতিক অবস্থা নিয়ে ব্যথিত ছিলেন| তাঁর কাছে বিদেশী শাসন ভারতের জাতীয় জীবন পদ্ধতি ও মূল্যের উপর আঘাত ছিল|



অনেকের ধারণা যে রবীন্দ্রনাথ ভারতে ইংরাজ শাসনের কুফল সম্বন্ধে ওয়াকিবাল ছিলেন না| অথবা তার বিশ্বমানবতা তাকে জাতীয়তাবাদের পথ থেকে দুরে সরিয়ে রাখে| কেবল বঙ্গভঙ্গে যুগেই তিনি শুধু স্বদেশিকতার দিকে ঝুঁকেছিলেন| তা কিন্তু একেবারেই নয়| বঙ্গ ভঙ্গের অনেক আগে, ১৮৯৩ ক্রিস্টাব্দে তার লেখা প্রবন্ধ, ‘ইংরাজ ও ভারতবাসী’ তে তিনি বলছেন-

“ইংরেজও আপনার চরিত্রের মধ্যে ঔধ্যতকে যেন কিছু বিশেষ গৌরবের সহিত পালন করে| তাহার দ্বৈপায়ন সংকীর্ণতার মধ্যে সে যে অটল এবং ভ্রমণ অথবা রাজত্ব উপলক্ষ্যে সে যাহাদের সংস্রবে আসে তাহাদের সহিত মেলামেশা করিবার সে কিছুমাত্র প্রয়াস পায় না,....তাহার ভাবখানা এই যে, ঢেঁকি যেমন স্বর্গেও ঢেঁকি তেমনি ইংরাজ সর্বত্রই খাড়া ইংরাজ, কিছুতেই তাহার অন্যথা হইবার জো নাই”

সে যুগে ভারতীয়রা ইংরেজদের থেকে নাগপাশ থেকে উদ্ধার পাওয়ার কোনো পথ ই দেখতে পাচ্ছিল না| রবীন্দ্রনাথ শেষ অংশে এক যুগপুরুষের অপেক্ষায় আছেন যাকে তিনি গুরুদেব বলে সম্বোধন করছেন|

“আমাদের সেই গুরুদেব আজিকার দিনের ই উদ্ভ্রান্ত কোলাহলের মধ্যে নাই; তিনি মান চাহিতেছেন না, পদ চাহিতেছেন না, ইংরেজি কাগজের রিপোর্ট চাহিতেছেন না, তিনি সমস্ত মত্ততা হইতে মুঢ জনস্রোতের আবর্ত হইতে আপনাকে সযত্নে রক্ষা করিতেছেন; কোন একটি বিশেষ আইন সংশোধন বা বিশেষ সভায় স্থান পাইয়া আমাদের দেশের কোনো যথার্থ দুর্গতি দূর হইবে আশা করিতেছেন না”

কে এই গুরুদেব? তিনিই কি পরবর্তী কালের সেই রবীন্দ্রনাথ যিনি কল্লোলিনী কলকাতা ছেড়ে বীরভূমের উষর প্রান্তরে শান্তিনিকেতনে ভারতের উন্নতিকল্পে তপস্যায়ে নিমগ্ন হন| তাঁর পথ ভারতের স্বাধীনতার পথ নয়, ভারতের মুক্তির পথ|

বঙ্গ ভঙ্গের ঘোরতর দিনে রবীন্দ্রনাথ জাতীয়জীবনের সম্মুখার্ধে উঠে এসেছিলেন| সে সময় জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়ির ভেতরে গোপন বৈঠক হত| পুলিশ সব জানত, কিন্তু বিশেষ ঘাঁটাত না| অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর স্মৃতিচারনা ‘ঘরোয়া’ গ্রন্থে সে সব দিনের বর্ণনা দিয়েছেন|

জাতীয়তাবাদীদের একটি লক্ষণ হলো তারা দেশের দুঃখ দুর্দশার দোষ শাসকের ঘাড়ে চাপিয়েছি খান্ত| রবীন্দ্রনাথ এই দৃষ্টিভঙ্গির কঠোর সমালোচক ছিলেন| তিনি ২২ জুলাই, ১৯০৫ কলকাতার মিনার্ভা প্রেক্ষাগৃহে ‘স্বদেশী সমাজ’ নামক একটি ধীর্ঘ প্রবন্ধটি পাঠ করেন| জনতার দাবিতে প্রবন্ধটি তার অসুস্থতা সত্বেও অন্য একদিন দ্বিতীয়বার পাঠ করতে হয়| রবীন্দ্রনাথের ভাষায় স্বদেশী সমাজ এর মর্মকথা এই রূপ- “সরকার বাহাদুর-নামক একটা অমানবিক প্রভাব ছাড়া আমাদের অভাব-নিবারণের আর কোনো উপায় আমাদের হাতে নেই, এই ধারণা মনে বদ্ধমূল হতে দেওয়াতেই, আমরা নিজের দেশকে নিজে যথার্থভাবে হারাই| আমাদের নিজের দেশ যে আমাদের নিজের হয় নি তার প্রধান কারণ এ নয় যে, এ দেশ বিদেশীর শাসনাধীনে| আসল কথাটা এই যে, যে দেশে দৈবক্রমে জন্মেছি মাত্র সেই দেশে সেবার দ্বারা, ত্যাগের দ্বারা, তপস্যা দ্বারা, জানার দ্বারা, বোঝার দ্বারা সম্পুর্ন আত্মীয় করে তুলি নি- একে অধিকার করতে পারি নি| নিজের বুদ্ধি দিয়ে, প্রাণ দিয়ে, প্রেম দিয়ে যাকে গড়ে তুলি তাকেই অধিকার করি”|

এর নাম ই রবীন্দ্রনাথ দিয়েছিলেন আত্মশক্তি| ভারত বর্ষের ইতিহাস কে রবীন্দ্রনাথ শুধু ক্ষমতার জন্য মারামারি কাটাকাটির ইতিহাস হিসেবে দেখতে অস্বীকার করেছেন| বিদেশীরাই ভারতের ইতিহাসের মুখ্য উপাদান নয়| দিল্লি আগ্রা যখন ছিল, তখন কাশী ও নবদ্বীপ ই ছিল| ‘আমরা ভারতের আগাছা-পরগাছা নহি, বহু শতশতাব্দীর মধ্য দিয়া আমাদের শতসহস্র শিকড় ভারতবর্ষের মর্মস্থান অধিকার করিয়া আছে| কিন্তু দূরদৃষ্ট-ক্রমে এমন ইতিহাস আমাদিগকে পড়িতে হয় যে, ঠিক সেই কথাটাই আমাদের ছেলেরা ভুলিয়া যায়| মনে হয় ভারতবর্ষের মধ্যে আমরা যেন কেহই না, আগুন্তুক বর্গই সব| নিজের দেশের সঙ্গে নিজের সম্বন্ধ এই রূপ অকিঞ্চিত্কর বলিয়া জানিলে, কথা হইতে আমরা প্রান আকর্ষণ করিব’ |

রবীন্দ্রনাথের গান ও কবিতা আমাদের ভালো লাগে কারণ তিনি আমাদের হৃদয়ে প্রবেশ করবার পদ্ধতি জানতেন| যা কিছু ভেবেছি, অনুভব করেছি, অথচ প্রকাশ করতে পারিনি রবীন্দ্রনাথ আমাদের জন্য তা করে দিয়ে গেছেন| ‘ভাষাহারা মম বিজন রোদনা/প্রকাশের লাগি করেছে সাধনা/চিরজীবনের বাণীর বেদনা’ রবীন্দ্রনাথে ব্যক্ত| একই ভাবে রবীন্দ্রনাথ দেশের হৃদয়ে প্রবেশ করার পদ্ধতি জানতেন| আশা করি আমরা তাঁর সেই পক্ষের ও অনুশীলন করবো|

Saturday, November 10, 2018

প্রিয়দর্শী দত্ত

স্বদেশচিন্তায় রবীন্দ্রনাথ

প্রিয়দর্শী দত্ত



ঠিক যে বছর রবীন্দ্রনাথের জন্ম হয় অর্থাত ১৮৬১ ক্রিস্টাব্দে ভারতীয়রা প্রথম আইন সভা বা লেজিসলেটিভ কাউন্সিলগুলি তে প্রবেশ করার অধিকার পায়| তাঁর ঠাকুরদা প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর (১৭৯৪-১৮৪৬) তো চাইতেন খোদ ইংল্যান্ডের পার্লামেন্টে ভারতীয়দের প্রতিনিধিত্ব হউক| কিন্তু এ বিষয় উইলিয়াম গ্ল্যাডস্টোনের সঙ্গে তার আলোচনা নিষ্ফল হয়| পিতা দ্বারকানাথ ঠাকুর (১৮১৮-১৯০৫)ছিলেন সম্পুর্ন ভিন্ন প্রকৃতির মানুষ | যৌবনের উন্মেষই উপনিষদের দর্শনের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তৈরী করেন তত্ত্ববোধিনী সভা| পরবর্তী কালে সভা মৃতপ্রায় ব্রাহ্মসমাজে বিলীন হয়ে তাকে সঞ্জীবিত করে। রবীন্দ্রনাথের উপর তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রভাব ছিল যেমন ভারতীয় সংস্কৃতির উপর হিমালয়ের|  কেবল একবারই ২৯ জুলাই, ১৮৫৩ ক্রিস্টাব্দে কলকাতার টাউন হলের জন সভায়ে তাকে ভারতে রাজনৈতিক সংস্কারের কথা বলতে শোনা গিয়েছিল|

উনিশ শতকের বাংলায়ে যে রাজনৈতিক সচেতনাতার আবহ দেখা গিয়েছিল কি এক কারণে বাংলার তিন মনীষী বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ ও স্বামী বিবেকানন্দ তার থেকে দুরে থাকেন| কিন্তু এই ত্রয়ীকে না পড়লে ভারতবর্ষের মূল স্বরূপ ই অধরা থেকে যায়| বঙ্কিমচন্দ্র ইতিহাস চেতনার স্রষ্টা, ও দেশ কে প্রথম দেশমাতৃকা রূপে প্রতিষ্ঠিত করেন| স্বামী বিবেকানন্দ হিন্দুজাতির গৌরববোধ জাগিয়ে ছিলেন ও ভারতবর্ষ কে রাজনৈতিক নয় আধ্যাত্মিক দৃষ্টি দিয়ে দেখেছিলেন| রবীন্দ্রনাথের কাছে স্বদেশ ভারতের চিরন্তন ভাবনা, জীবন মূল্য আর জীবন শৈলীর মুর্ত্য রূপ| এই ত্রিমূর্তি প্রতক্ষ্য ভাবে ভারতের স্বাধীনতার কথা বললেনি| বঙ্কিম চন্দ্র ও বিবেকানন্দের যুগে সে দাবি ওঠেই নি| কিন্তু রবীন্দ্রনাথের দীর্ঘ জীবনকালে সে দাবি পরিনত| অরবিন্দ, গান্ধী, নেহেরু, সুভাষচন্দ্র অনেকের সাথেই তার সুসম্পর্ক ছিল| কিন্তু রবীন্দ্রনাথ গেয়েছেন মুক্তির গান, দিয়েছিলেন আপনার সাধনা দ্বারা দেশ কে স্বদেশ করে তোলার বার্তা| যে সময় ভারতের জাতীয় আন্দোলন নদী আপন বেগে পাগল পারা সেই সময় রবীন্দ্রনাথ যেন স্বব্ধ চাঁপার তরু গন্ধে ভরা|‘আমি সদা অচল থাকি, গভীর চলা গোপন রাখি’ অথবা ‘আমার চলা যায়না বলা- আলোর পানে প্রানের চলা’|

রবীন্দ্রনাথের সার্বজনিক জীবন শুরু হয়েছিল এক জাতীয়তাবাদী মঞ্চে- হিন্দু মেলা| এই বাত্সরিক মেলার প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন ব্যায়ামবীর নবগোপাল মিত্র ও পৃষ্ঠপোষক ছিল জোড়াসাঁকোর ঠাকুরপরিবার| মেলা আয়োজিত হয়েছিল পর পর নয় বছর – ১৮৬৭ থেকে ১৮৭৬| এখানেই ১৮৭৫ ক্রিস্টাব্দে ১৪ বত্সরের কিশোর   রবীন্দ্রনাথ জনসমক্ষে তাঁর প্রথম কবিতা পাঠ করেন – হিন্দু মেলার উপহার| কয়েকদিন পরেই এই কবিতাটি অমৃতবাজার পাত্রিকায়ে প্রকাশিত হয়|

হিন্দু মেলার মাধ্যমেই বাংলায়ে দেশাত্মবোধক গানের সূত্রপাত হয়| রবীন্দ্রনাথের বড়দা ও ভারতের প্রথম ICS অফিসার সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন –“মিলে সব ভারত সন্তান/এক তান মন প্রাণ/ গাও ভারতের যশোগান” ইত্যাদি| হিন্দু মেলা দীর্ঘজীবি হয় নি কিন্তু পরবর্তী কালে বাংলায় জাতীয়বাদী আন্দোলনের মানস ভিত্তিভূমি রচনা করে|

উনিশ শতকের শেষ প্রান্তে রবীন্দ্রনাথ মধ্য যৌবনে| এক দিকে প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান, ইতিহাস চর্চা, বঙ্কিমের সাহিত্য, অন্যদিকে স্বামী বিবেকানন্দের বিশ্বমঞ্চে উদয়, তার সিংহল বক্তৃতা ভারতে হিন্দু গৌরবের ঘোষনা করছে| কবি এই দশকে লেখেন ‘কথা ও কাহিনী’| গৌতম বুদ্ধ, শিবাজি, তাঁর গুরু সমর্থ রামদাস, শিখ গুরু গোবিন্দ সিংহ, তরু সিংহ, বন্দা বাহাদুর ইত্যাদি অনেকের বৃতান্ত এতে স্থান পেয়েছে| অনেকে রবীন্দ্রনাথ যে হিন্দু জাতীয়তাবাদের সমর্থক ছিলেন তা প্রমান করতে এই সব কবিতার উদ্ধৃতি দেন| অন্যরা তাঁকে বিশ্বমানব, মহামিলনের প্রতীক ইত্যাদি বলেন| সম্যক ভাবে রবীন্দ্রনাথের চিন্তার গভীরতা মাপতে আমরা এখনো অসমর্থ|

রবীন্দ্রনাথের মধ্যে যে ভারতবোধ মজ্জাগত ছিল তা ইতিহাস বা রাজনীতি নয় কৃষ্টি| তাতে ছাতিমের শীতল গন্ধের মত উপনিষদ, রামায়ন, মহাভারত ও কালিদাসের কাব্যের নির্যাস ছিল| ইতিহাসের ঘটনাবহুলতা রাজনীতির কচকচানির মত তাকে তাকে ক্লান্ত করত| কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ভারতের তত্কালীন রাজনৈতিক অবস্থা নিয়ে ব্যথিত ছিলেন| তাঁর কাছে বিদেশী শাসন ভারতের জাতীয় জীবন পদ্ধতি ও মূল্যের উপর আঘাত ছিল|



অনেকের ধারণা যে রবীন্দ্রনাথ ভারতে ইংরাজ শাসনের কুফল সম্বন্ধে ওয়াকিবাল ছিলেন না| অথবা তার বিশ্বমানবতা তাকে জাতীয়তাবাদের পথ থেকে দুরে সরিয়ে রাখে| কেবল বঙ্গভঙ্গে যুগেই তিনি শুধু স্বদেশিকতার দিকে ঝুঁকেছিলেন| তা কিন্তু একেবারেই নয়| বঙ্গ ভঙ্গের অনেক আগে, ১৮৯৩ ক্রিস্টাব্দে তার লেখা প্রবন্ধ, ‘ইংরাজ ও ভারতবাসী’ তে তিনি বলছেন-

“ইংরেজও আপনার চরিত্রের মধ্যে ঔধ্যতকে যেন কিছু বিশেষ গৌরবের সহিত পালন করে| তাহার দ্বৈপায়ন সংকীর্ণতার মধ্যে সে যে অটল এবং ভ্রমণ অথবা রাজত্ব উপলক্ষ্যে সে যাহাদের সংস্রবে আসে তাহাদের সহিত মেলামেশা করিবার সে কিছুমাত্র প্রয়াস পায় না,....তাহার ভাবখানা এই যে, ঢেঁকি যেমন স্বর্গেও ঢেঁকি তেমনি ইংরাজ সর্বত্রই খাড়া ইংরাজ, কিছুতেই তাহার অন্যথা হইবার জো নাই”

সে যুগে ভারতীয়রা ইংরেজদের থেকে নাগপাশ থেকে উদ্ধার পাওয়ার কোনো পথ ই দেখতে পাচ্ছিল না| রবীন্দ্রনাথ শেষ অংশে এক যুগপুরুষের অপেক্ষায় আছেন যাকে তিনি গুরুদেব বলে সম্বোধন করছেন|

“আমাদের সেই গুরুদেব আজিকার দিনের ই উদ্ভ্রান্ত কোলাহলের মধ্যে নাই; তিনি মান চাহিতেছেন না, পদ চাহিতেছেন না, ইংরেজি কাগজের রিপোর্ট চাহিতেছেন না, তিনি সমস্ত মত্ততা হইতে মুঢ জনস্রোতের আবর্ত হইতে আপনাকে সযত্নে রক্ষা করিতেছেন; কোন একটি বিশেষ আইন সংশোধন বা বিশেষ সভায় স্থান পাইয়া আমাদের দেশের কোনো যথার্থ দুর্গতি দূর হইবে আশা করিতেছেন না”

কে এই গুরুদেব? তিনিই কি পরবর্তী কালের সেই রবীন্দ্রনাথ যিনি কল্লোলিনী কলকাতা ছেড়ে বীরভূমের উষর প্রান্তরে শান্তিনিকেতনে ভারতের উন্নতিকল্পে তপস্যায়ে নিমগ্ন হন| তাঁর পথ ভারতের স্বাধীনতার পথ নয়, ভারতের মুক্তির পথ|

বঙ্গ ভঙ্গের ঘোরতর দিনে রবীন্দ্রনাথ জাতীয়জীবনের সম্মুখার্ধে উঠে এসেছিলেন| সে সময় জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়ির ভেতরে গোপন বৈঠক হত| পুলিশ সব জানত, কিন্তু বিশেষ ঘাঁটাত না| অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর স্মৃতিচারনা ‘ঘরোয়া’ গ্রন্থে সে সব দিনের বর্ণনা দিয়েছেন|

জাতীয়তাবাদীদের একটি লক্ষণ হলো তারা দেশের দুঃখ দুর্দশার দোষ শাসকের ঘাড়ে চাপিয়েছি খান্ত| রবীন্দ্রনাথ এই দৃষ্টিভঙ্গির কঠোর সমালোচক ছিলেন| তিনি ২২ জুলাই, ১৯০৫ কলকাতার মিনার্ভা প্রেক্ষাগৃহে ‘স্বদেশী সমাজ’ নামক একটি ধীর্ঘ প্রবন্ধটি পাঠ করেন| জনতার দাবিতে প্রবন্ধটি তার অসুস্থতা সত্বেও অন্য একদিন দ্বিতীয়বার পাঠ করতে হয়| রবীন্দ্রনাথের ভাষায় স্বদেশী সমাজ এর মর্মকথা এই রূপ- “সরকার বাহাদুর-নামক একটা অমানবিক প্রভাব ছাড়া আমাদের অভাব-নিবারণের আর কোনো উপায় আমাদের হাতে নেই, এই ধারণা মনে বদ্ধমূল হতে দেওয়াতেই, আমরা নিজের দেশকে নিজে যথার্থভাবে হারাই| আমাদের নিজের দেশ যে আমাদের নিজের হয় নি তার প্রধান কারণ এ নয় যে, এ দেশ বিদেশীর শাসনাধীনে| আসল কথাটা এই যে, যে দেশে দৈবক্রমে জন্মেছি মাত্র সেই দেশে সেবার দ্বারা, ত্যাগের দ্বারা, তপস্যা দ্বারা, জানার দ্বারা, বোঝার দ্বারা সম্পুর্ন আত্মীয় করে তুলি নি- একে অধিকার করতে পারি নি| নিজের বুদ্ধি দিয়ে, প্রাণ দিয়ে, প্রেম দিয়ে যাকে গড়ে তুলি তাকেই অধিকার করি”|

এর নাম ই রবীন্দ্রনাথ দিয়েছিলেন আত্মশক্তি| ভারত বর্ষের ইতিহাস কে রবীন্দ্রনাথ শুধু ক্ষমতার জন্য মারামারি কাটাকাটির ইতিহাস হিসেবে দেখতে অস্বীকার করেছেন| বিদেশীরাই ভারতের ইতিহাসের মুখ্য উপাদান নয়| দিল্লি আগ্রা যখন ছিল, তখন কাশী ও নবদ্বীপ ই ছিল| ‘আমরা ভারতের আগাছা-পরগাছা নহি, বহু শতশতাব্দীর মধ্য দিয়া আমাদের শতসহস্র শিকড় ভারতবর্ষের মর্মস্থান অধিকার করিয়া আছে| কিন্তু দূরদৃষ্ট-ক্রমে এমন ইতিহাস আমাদিগকে পড়িতে হয় যে, ঠিক সেই কথাটাই আমাদের ছেলেরা ভুলিয়া যায়| মনে হয় ভারতবর্ষের মধ্যে আমরা যেন কেহই না, আগুন্তুক বর্গই সব| নিজের দেশের সঙ্গে নিজের সম্বন্ধ এই রূপ অকিঞ্চিত্কর বলিয়া জানিলে, কথা হইতে আমরা প্রান আকর্ষণ করিব’ |

রবীন্দ্রনাথের গান ও কবিতা আমাদের ভালো লাগে কারণ তিনি আমাদের হৃদয়ে প্রবেশ করবার পদ্ধতি জানতেন| যা কিছু ভেবেছি, অনুভব করেছি, অথচ প্রকাশ করতে পারিনি রবীন্দ্রনাথ আমাদের জন্য তা করে দিয়ে গেছেন| ‘ভাষাহারা মম বিজন রোদনা/প্রকাশের লাগি করেছে সাধনা/চিরজীবনের বাণীর বেদনা’ রবীন্দ্রনাথে ব্যক্ত| একই ভাবে রবীন্দ্রনাথ দেশের হৃদয়ে প্রবেশ করার পদ্ধতি জানতেন| আশা করি আমরা তাঁর সেই পক্ষের ও অনুশীলন করবো

Sunday, July 29, 2018

প্রিয়দর্শী দত্ত

প্রেমের ভূত


প্রিয়দর্শী দত্ত


কল্পনাও করে উঠতে পারিনি যে গল্পটা ঠিক ওই ভাবে শুরু হয়ে যাবে- রাইসিনা স্কুলের হল-ঘরে, গল্প বলার আসরে, আমার জীবনে| পৌলমী মেয়েটি যেন দিন-দুপুরে রাগ অঘোরীর তান ধরে মধ্যরাত্রি নামিয়ে আনলো| সুরের মুর্চ্ছনাতে নয়, গা ছম ছম ভুতের গল্প শুরু করে| স্বীকার করি গল্পটি তার নিজের নয়, রাজ শেখর বসু ওরফে পরশুরামের| সে যুগে ‘উৎস’ বলে একটি সংগঠন বাংলা দিল্লির স্কুলগুলো কে নিয়ে একটা আন্ত:স্কুল প্রতিযোগিতার আয়োজন করত| গল্প বলা, তাত্ক্ষনিক বক্তৃতা ইত্যাদি| সেদিন সব ছাত্র ছাত্রীরাই বলার জন্য খ্যাতনামা লেখকদের এক একটা ছোট গল্প বেছে নিয়েছিল| কেউ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, কেউ রবীন্দ্রনাথ, কেউ বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, কেউ তারাশংকর বা আশাপূর্ণা দেবী| যতদুর মনে পড়ে আমি সত্যজিত রায়ের একটা গল্প বলেছিলাম| সেটা ছিল একটা ‘লাস্ট লাইন শকার’ অর্থাত শেষ পঙ্ক্তি টি পড়লেই তবেই গল্পের রহস্যটা ব্যক্ত হবে|

     কিন্তু ইউনিয়ন একাডেমির একাদশ শ্রেনীর ছাত্রী পৌলমী গল্পটির শুরুতেই এক অদ্ভুত আবহ সৃষ্টি করেছিল| পরশুরামের গল্পটির নাম জটাধারী বক্সী না জটাধর বক্সী এমনি কিছু একটা ছিল| আসলে ব্যোমকেশ বক্সী সুত্রে নামটা মনে রেখেছি কারণ ব্যোমকেশ ও যিনি, জটাধর ও তিনি, অর্থাৎ মহাদেব শিব| পৌলমী এই বলে শুরু করলো যে আমরা যেখানে বসে রয়েছি, সেই গোল মার্কেটর পেছন দিকেই একটা পাড়া আছে কুচা চমৌকিরাম, সেখানে এক শীতল পৌষ মাসের সন্ধ্যেবেলা কালী বাবুর চায়ের দোকানে বাঙালিদের আড্ডা বসেছে| সত্যি বলতে কি তার পরের কয়েকটা লাইন আর আমি বেমালুম মিস করে গেছিলাম| কিন্তু এমন কি কখনো আপনার সঙ্গে হয়নি যে গায়িকার সৌন্দর্যে বিমোহিত হয়ে আপনি রবীন্দ্রসংগীতের কয়েকটা লাইন ছেড়ে গেছেন? হয়ত বা পুরো গানটাই|

     যখন সম্বিত ফিরে পেলাম তখন জটাধর বক্সী দৃশ্যে ঢুকে পড়েছেন|সবার প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছেন যে তাঁর গল্পটি শেষ হলেই চায়ের দোকানের সবাই ততক্ষনাৎ ভূত দেখতে পাবে| যদি তিনি না দেখাতে পারেন, তবে সবার চায়ের দাম টা চুকিয়ে দেবেন| তার পর তিনি ফেঁদে বসলেন এক অদ্ভুত আষাঢে গল্প বর্মা-তাইল্যান্ড সীমান্তে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়কার| কিন্তু শীতের সন্ধ্যে, তার পর গরম চায়ের পেয়ালা, সেই জাদুবাস্তবতার আবেদন অমান্য করা যায়না| গল্প কি ভাবে শেষ হয়েছিল মনে নেই| কিন্তু প্রচুর হাত-তালি পড়েছিল মনে আছে|

     সেই দিন ই এক বারের জন্য পৌলমীর সাথে দেখা হয়েছিল| রাইসিনা স্কুলের করিডরে প্রতিযোগিতা শেষে| ভয়ে বুকটা দুরুদুরু করছিল, সেটা শৈশবের ভুতের ভয় নয়, কৈশোরের ভয়|তাকে দেখে কেন জানিনা তাসের ইস্কাবনের বিবির মত লাগছিল|আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম কুচা চামৌকিরাম বলে কি সত্যিই কোনো জায়গা গোল মার্কেটে আছে, মানে রাজ শেখর বসু কি দিল্লির ভূগোল জানতেন? না কি তার বন্ধু মেঘনাদ সাহার মুখে দিল্লির বর্ণনা শুনে লিখে দিয়েছিলেন কিছু একটা|  পৌলামি অদ্ভুত হাসি হেসে বলেছিল হয়তো আছে| তার পর আর কোনো কথা হয়নি| রবীন্দ্রনাথের জীবন স্মৃতির সেই জোড়াসাঁকোর বাড়ির ভেতরেই অদৃশ্য রাজবাড়ির মত তার সন্ধান আজ ও পেলাম না|

     পৌলমীর সাথে দেখা হত প্রায়ই| গরমকাল শুরু হতেই ভোর রাতে যখন ঘুম ভেঙ্গে যেত বুঝতে পারতাম সে তো এসেছিল|দশটা বাজলেই ভাবতাম এবার সে সময় করে আমাদের সে দিন কার সাক্ষাতের কথাটা ভাবছে| করল বাগ থেকে মন্দির মার্গ দিয়ে ফিরতে ফিরতে ভাবতাম পেশওয়া রোডের মোড়ের মাথায় তার সাথে দেখা হবেই| দশ মিনিট অপেক্ষাও করতাম| দেখা হয়েছিল কি? যাক সে সব কথা| কত যুগ কেটে গেছে|

     হুডমুড্ করে বছর গুলো কোথায় চলে গেল| তাসের ডমিনো এফেক্ট এর মত অনেক স্বপ্ন ভেঙ্গে পড়ল| জীবনে যা ভেবে দেখিনি এমন অনেক প্লান ও সার্থক হলো| কিন্তু মন্দির মার্গ দিয়ে ফিরতে ফিরতে মনে হয় আবার আমি সেই ক্লাস ইলেভান সাইন্সর ছাত্র| হয়ত যদি চলে যেতে পারতাম আমেরিকা, কানাডা, ইংল্যান্ড, জার্মানি নিদেন পক্ষে বাঙ্গালোর, হ্য্দেরাবাদ, পুনে তাহলে ভালো হত| সব ভুলে যেতে পারতাম| কিন্তু একেই শহরে থেকে যাওয়ার ফলে অতীত বর্তমান সবই সব সময় কাছাকাছি|

আপনারা জানেন যে মার্কেটিংর সুত্রে আমাকে দিল্লির এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াতে হয়| সেদিন একটা ঝটকা লাগলো| গিয়েছিলাম ইস্ট প্যাটেল নগরের একটা অফিসে| ভেবেছিলাম মাল সাপ্লাইর অর্ডার টা আমরা পাবো| কিন্তু ব্যাপার টা সে রকম ফলপ্রসু হলনা| কিন্তু কাকতালীয় ভাবে এক বাঙালি কর্মীর সাথে দেখা হয়ে গেল সেই অফিসে| কার্ডটা এখনো রয়েছে, দিব্যেন্দু সোম, পারচেসিং অফিসার| কথায় কথায় জানা গেল সে ইউনিয়ন একাডেমির প্রাক্তন ছাত্র, আমাদের বছরেই পাস করে বেরিয়েছে|ভাবলাম পৌলমীর কথাটা জিজ্ঞেস করি, সেও তো তখন ১১ এ যখন আমি ১১| তাহলে ও ওর ব্যাচমেট ছিল| জিজ্ঞেস করলাম কত দিন পড়েছেন ইউনিয়ন একাডেমির তে| সে বলল প্রায় আট বছর, ক্লাস ফাইভ থেকে টুএলভ| “যখন থেকে বাবা লখনৌ থেকে বদলি হয়ে দিল্লি এলেন’| আমি ও সবে আগ্রহী ছিলাম না| ভাবলাম পৌলমীর বিষয় জিজ্ঞেস করি, কিন্তু কি উত্তর পাব, পৌলমীর হয়ত বিয়ে হয়ে গেছে, পরিবার আছে, হয়ত অস্ট্রেলিয়া চলে গেছে| সাহস করে জিজ্ঞেস করলাম “আচ্ছা পৌলামি বলে কাউকে চেনেন, ইউনিয়ন একাডেমির?”
‘পৌলমী ঘটক, ব্যাডমিন্টন খেলত?’| ‘ব্যাডমিন্টন নয় টেবিল টেনিস, সে তো বেস্ট বেঙ্গল কে রিপ্রেসেন্ট করত, তার কথা কেন বলবো?’| “আপনাদের ক্লাসে পৌলমী সিনহা বলে এক জন ছিল না, কম্পিটিশন এ অংশগ্রহণ করতো”| “পৌলমী আমাদের ক্লাসে? আমাদের স্কুলে ও নামে কেউ ছিল বলে মনে নেই”| “মৌসুমী নয় তো, মৌসুমী মুখার্জী ও ড্রয়িং করত ভালো”|

‘আরে না পৌলমী বললাম তো, ড্রয়িং করত কিনা জানিনা’| দিব্যেন্দু কাকে জানিনা ফোন করলো, কোনো এক মহিলা কে, মোবাইল টা স্পিকার এ রেখে দিল| জিজ্ঞেস করলো, “আচ্ছা অরুন্ধতি, মেয়েদের মধ্যে আমাদের স্কুলে পৌলমী বলে কেউ ছিল, মনে আছে?” ও দিক থেকে উত্তর এলো, “না তো কোনদিন দেখিনি, শুনি ও নি”|

তবে কি গোড়ায় গলদ? আমি ভুলে গেছি? আরে আমি কি করে ভুলবো? পৌলমী!

Saturday, May 5, 2018

প্রিয়দর্শী দত্ত

দিল্লি কবে থেকে হিন্দি সাহিত্যের কেন্দ্রবিন্দু হলো?

প্রিয়দর্শী দত্ত


মধ্য দিল্লির চার বাই উনিশ অসফ আলী রোডের উপর অবস্থিত হিন্দি জগতের বৃহত্তম প্রকাশনী সংস্থা ‘প্রভাত প্রকাশন’| তারা সাম্প্রতিক কালে ইংরেজি প্রকাশনা তেও হাত দিয়েছে| উল্লেখযোগ্য ভাবে প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রয়াত শ্রী এ পি জে আব্দুল কলামের প্রায়  সব কটি গ্রন্থ তারাই হিন্দি ও ইংরেজি তে প্রকাশ করেছে| গত ২৩ বছর ধরে প্রভাত প্রকাশন ‘সাহিত্য অমৃত’ নামে একটি মাসিক ও প্রকাশ করে| পত্রিকাটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন সংস্কৃত ও হিন্দির প্রথিতযশা পণ্ডিত শ্রী বিদ্যানিবাস মিশ্র (১৯২৬-২০০৫)|বর্তমানে যাঁর উপর এই ভার ন্যস্ত, তিনি সম্ভবত ভূভারতে প্রবীনতম সম্পাদক| ত্রৈলোক্যনাথ চতুর্বেদী, বয়স নব্বুই, অবকাশ প্রাপ্ত IAS আধিকারিক, ভূতপূর্ব CAG, পদ্ম বিভূষণ প্রাপ্ত, কর্ণাটকের প্রাক্তন রাজ্যপাল| পত্রিকার প্রত্যেক সংখ্যাতে পাঁচ/ছয় পাতা জুড়ে থাকে তার ছয়/সাতটা বিষয়ের উপর সাক্ষরিত সম্পাদকীয় বা সাইনড এডিটরিয়াল|

প্রায় আশি পাতার মাসিকে ওই গুলোই হয়ত দিল্লির নিশ্চিত অবদান| বাকি কাহিনী, কবিতা, প্রবন্ধ ইত্যাদির মধ্যে দিল্লির থেকে একটা আধটা লেখা থাকতেও পারে আবার নাও পারে| বোঝা সহজ কারণ সব লেখার শেষেই লেখক/লেখিকার (হিন্দিতে পরিচয়টা এখনো লিঙ্গ-নিরপেক্ষ হয়ে যায় নি) নাম, ঠিকানা ও মোবাইল নম্বর দেওয়া থাকে| লেখা আসে কানপুর, এলাহাবাদ, লখনৌ, শিমলা, জয়পুর, ভোপাল, ইন্দোর, পাটনা, নাগপুর, পুনে, মুম্বাই, রায়পুর এমন কি বিশাখাপত্তনম থেকে|দিল্লি কি তাহলে সত্যিই এখনো হিন্দি সাহিত্যের উত্পাদক হয়ে উঠতে পারেনি?দেশ পত্রিকা, সাপ্তাহিক বর্তমান, আনন্দমেলা, নবকল্লোলের লেখকদের মধ্যে সিংহ ভাগ হবে কলকাতার বাইরের হবে এটা কল্পনা করা যায়না|

আমার কথা শুনে শম্ভুনাথ হয়ত হাসবেন|আসলে হিন্দি সাহিত্যের ভূগোল টা তো এমনিই| তার লেখকরাও সারা ভারতে ছাড়িয়ে আছেন| তিনি কলকাতা থেকে প্রকাশিত সাহিত্য মাসিক ‘বাগর্থ’ সম্পাদন করেন| কার্যালয় ভারতীয় ভাষা পরিষদ ৩৬ এ, শেক্সপিয়ার সারণী| দেখতে দেখতে বাগর্থের ও প্রায় ২৫ বছর হয়ে গেল, ইতিমধ্যে বেরিয়ে গেছে ২৭৫ টি সংখ্যা| কলকাতার থেকে হিন্দি পত্রিকা? অনেক বাঙালি বাবুই হয়ত হাসবেন| বাঙালিরা সাধারণত ফরাসী, জার্মান ও ল্যাটিন মার্কিন সাহিত্যে কি ঘটছে তা নিয়ে ওয়াকিবহাল হলেও হিন্দি, তামিল, মালায়ালম, অসমীয়া, উড়িয়া তে কি হচ্ছে তা নিয়ে নয়| এ সব ভাষার সাহিত্য বাংলায় বিশেষ অনুদিত হয় না, যদিও বিদেশী সাহিত্যের সম্ভার বেশ সমৃদ্ধ| কিন্তু কলকাতাই ছিল আধুনিক হিন্দির পীঠস্থান| এখানে থেকেই প্রায় দুশো বছর আগে হিন্দির প্রথম সংবাদ পত্র ‘উদন্ত মার্ত্য্ন্ড’ প্রকাশিত হয়| প্রকাশক/সম্পাদক যুগল কিশোর শুক্ল আদপে ছিলেন কানপুরে, কিন্তু কোম্পানি বাহাদুরের চাকরি সূত্রে থাকতে হত কলকাতায়| আধুনিক হিন্দির প্রথম লেখক লাল্লু লালের (১৭৬৩-১৮৩৫) জন্ম আগ্রায়ে একটি গুজরাতি ব্রাহ্মণ পরিবারে হলেও তিনি কর্ম জীবন কাটিয়েছেন কলকাতাতেই| তত্কালীন ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে প্রশিক্ষক ছিলেন| তার বিখ্যাত ‘প্রেম সাগর’ তিনি কলকাতাতে বসে লিখেছিলেন|

আমাদের সময় অলকা সরায়োগী (জন্ম ১৯৬০, কলকাতা) আনন্দনগরী তে বসেই তার ছোট গল্প ও উপন্যাস লিখেছেন| কিন্তু কলকাতায় হিন্দি পত্রিকা বা সংবাদ পত্রের প্রকাশক থাকেল গ্রন্থ প্রকাশক কই? তাই প্রথম দুটি বই – কাহানি কী তলাশ মে (গল্প সংকলন) এবং কলি-কথা ভায়া বাইপাস (উপন্যাস) প্রকাশ করে পঞ্চকুলা-র (হরিয়ানা) এক অল্প শ্রুত প্রকাশক| কিন্তু যেই কলি-কথা ভায়া বাইপাস, ২০০১ সালে সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার পেল, অমনি দিল্লির এক প্রকাশনী সংস্থা রাজকমল প্রকাশন তাকে ধরে ফেলল| আর পঞ্চকুলার প্রকাশকের কাছে ফিরে যেতে হয় নি| দিল্লির প্রকাশকের হাত ধরেই এসেছে একের পর এক লেখা| তিন বছর আগে ২০১৫ ‘জানকীদাস তেজপাল ম্যানশন’ ও রাজকমল প্রকাশ করেছে|

দুই সহোদর ভাই অশোক মাহেশ্বরী এবং অরুণ মাহেশ্বরী স্বতন্ত্র ভাবে রাজকমল প্রকাশন (স্থা.১৯৪৭) ও বাণী প্রকাশন পরিচালনা করেন| এখন মাহেশ্বরী পরিবারের তৃতীয় প্রজন্ম প্রকাশন ব্যবসায়ে নিযুক্ত| এ ছাড়াও আছে রাজপাল এন্ড সন্স, হিন্দি সাহিত্য সদন ইত্যাদি| ডায়মন্ড পাবলিকেশন (স্থা.১৯৪৮) হিন্দি ছাড়া ইংরেজি, বাংলা, উর্দু, মারাঠি, গুজরাটি, অসমীয়া তে ও বই প্রকাশ করে|  

হিন্দি ভাষার ভূগোল টা সারা উত্তর ভারত জুড়ে বিস্তৃত| স্বাভাবিক ভাবে হিন্দি সাহিত্যের বলয়ও তেমনি| হিন্দি ভাষী রাজ্য যেমন ঝাড়খণ্ড, বিহার, উত্তর প্রদেশ, ছত্তিসগড়, মধ্য প্রদেশ, রাজস্থান, হরিয়ানা, হিমাচল প্রদেশ ও উত্তরাখণ্ড তো রয়েছেই| এছাড়া ও আছে পাঞ্জাব, যে প্রান্ত থেকে অনেক হিন্দি লেখক-লেখিকা এসেছেন| উনিশ শতকে আধুনিক হিন্দি ভাষা ও সাহিত্যের যে সব কেন্দ্র ছিল তার মধ্যে এলাহাবাদ, কানপুর, বারানসী, পাটনা ইত্যাদি প্রমুখ| তার মধ্যে কলকাতা ছিল, কিন্তু দিল্লি নয়| দিল্লির উপর মোগল প্রভাব থাকার জন্য উর্দু/ফার্সি ই প্রাধান্য পেয়েছে| দিল্লি মির্জা গালিব, ইব্রাহিম জউখের শহর হিসেবেই পরিচিত ছিল| মোগল যুগ শেষ হওয়ার পর এর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব অনেক কমে যায়| বাংলা, মহারাষ্ট্র, পাঞ্জাব ও সংযুক্ত প্রদেশ (অধুনা উত্তর প্রদেশ) ইত্যাদি তে যে নব চেতনার সঞ্চার হয়, দিল্লি তার থেকে অনেকটা দুরে থাকে|

উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে আধুনিক হিন্দির কথা সাহিত্য অনেকটা বেনারস-এলাহাবাদ-কানপুর অক্ষের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে|ভারেতেন্দু হরিশচন্দ্র ছিলেন বেনারসের, প্রতাপ নারায়ণ মিশ্র কানপুরের|বেনারাসেই তৈরি হয় ‘কাশী নাগরী প্রাচারিনি সভা’| ১৯০০ ক্রী এলাহাবাদের থেকে প্রকাশিত হয় হিন্দির প্রথম সাহিত্য পত্রিকা ‘সরস্বতী’| এর মূলে ছিলেন এক প্রবাসী বাঙালি বাবু চিন্তামনি ঘোষ যিনি ইন্ডিয়ান প্রেস এর প্রতিষ্ঠাতা| প্রসঙ্গত: গীতাঞ্জলী সহ রবীন্দ্রনাথের বহু গ্রন্থের মূল সংস্করণ এলাহাবাদের ইন্ডিয়ান প্রেস থেকেই প্রকাশিত হয়| আধুনিক হিন্দি সাহিত্যের নির্মাণে ‘সরস্বতী’ পত্রিকার ভূমিকা অতুলনীয়| মেদিনীপুরে বড় হয়ে ওঠা হিন্দির মহীরুহ কবি সূর্য কান্ত ত্রিপাঠি ‘নিরালা’ (১৮৯৬-১৯৬১) বলেছিলেন যে তিনি হিন্দি ভাষা সরস্বতী পত্রিকা পড়েই শিখেছিলেন|

কাশী নাগরী প্রচারিনি সভার আনুকূল্যে বেনারস থেকে হিন্দি সাহিত্যের অনেক গুলি সংকলন বেরয়| সে যুগে ছিল হিন্দি সাহিত্য প্রেস(এলাহাবাদ), ভারতী ভাণ্ডার/লিডার প্রেস (এলাহাবাদ),   গঙ্গা গ্রন্থাগার (লক্ষ্ণৌ), মুন্সী প্রেমচাঁদ নির্মিত সরস্বতী প্রেস (বেনারস) ইত্যাদি| হিন্দিতে রহস্য রোমাঞ্চ উপন্যাসের প্রথম স্রষ্টা ‘চন্দ্রকান্তা সন্ততি’ খ্যাত বাবু দেবকী নন্দন ক্ষত্রি (১৮৬১-১৯১৩)বেনারসে ‘লহরী প্রেস’ প্রতিষ্ঠা করেন| মূলত: বিহারের সমস্তিপুরের হলেও তিনি কর্মসূত্রে বেনারসে থাকতেন| লহরী প্রেস থেকে প্রকাশিত গ্রন্থে প্রকাশকের জায়গায় ইংরেজি তে জনৈক পান্না লাল রায়, ম্যানেজার, লহরী প্রেস  লেখা থাকত| Roy লিখতেন বলে অনুমান করি তিনি বাঙালি হতে পারেন| 

দিল্লিতে ১৮৫৭ এর পর মোগল শাসন শেষ হলেও প্রায় অর্ধশতাব্দী হিন্দি সাহিত্যের কোনো উন্মেষ দেখা যায় নি| ওদিকে উত্তর প্রদেশে তখন আধুনিক হিন্দি সাহিত্যের (গদ্য, প্রবন্ধ সাহিত্য, কাহিনী) দ্রুত বিকাশ হচ্ছে| তৈরি হচ্ছে মুদ্রণশালা|ভারতের রাজধানী ১৯১১ সালে দিল্লীতে স্থানান্তরিত হলো| বাস্তবে এই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হতে অনেক সময় লাগে| আর সমাজের স্বামী শ্রদ্ধানন্দ (মহাত্মা মুন্সী রাম)১৯১২ সালে দিল্লীর প্রথম হিন্দি দৈনিক ‘বিজয়’ এর সূচনা করেন, পরবর্তী কালে ১৯২৩ এ তিনি ‘অর্জুন’ এর প্রতিষ্ঠা করেন| এই দুই পত্রিকার মাধ্যমে দিল্লির প্রথম হিন্দি সাংবাদিক পণ্ডিত ইন্দ্র বাচস্পতি খবরের শিরোনামে চলে আসেন| ইনি পরে সাহিত্যিক রূপেও খ্যাতি অর্জন করেন| কিছুদিনের মধ্যে রামচন্দ্র শর্মা ‘মহারথী’ নামে এক সাপ্তাহিকের সম্পাদনা শুরু করেন| এবং কালান্তরে এই সাপ্তাহিক ই দিল্লির হিন্দি সাহিত্যের কেন্দ্র বিন্দু হয়ে দাঁড়ায়ে|

দিল্লির বহুসংখ্যক মানুষের কথ্য ভাষা চিরকাল হিন্দি ই ছিল| এবার যখন মনে হচ্ছিল সাহিত্যের কেন্দ্র বিন্দু তেও অচিরে হিন্দি উঠে আসবে, ঠিক সেই সময়ই একটা ঘটনা ঘটল যা হিন্দি কে সরিয়ে আবার উর্দু কে চাঙ্গা করে দিল| ঠিক ১৯৩৫ সালে গুলাম আলী বুখারী (১৯০৪-১৯৭০) দিল্লি রেডিও স্টেশনের ডিরেক্টর হয়ে আসেন| তিনি মূলত: পেশোয়ার এর ছিলেন এবং দেশ ভাগের পর পাকিস্তান রেডিওর প্রথম ডিরেক্টর-জেনারেল হন|১৯৩৫ থেকে ১৯৩৯ এই চার বছরে তিনি দিল্লির রেডিও স্টেশন কে উর্দু সাহিত্যকার দের আখড়া তৈরি হয়ে যায়| সরকারি কাজ কর্মে তো এমনি উর্দু চলে আসছিল| তাই হিন্দি সাহিত্যিকরা নিজের জায়গা তৈরি করতে পারছিল না|

কিন্তু ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শুরু হতেই রাজধানীর জীবন যাত্রায় যে বহুমুখী পরিবর্তন হলো হিন্দি সাহিত্য তার দ্বারা লাভবান হলো| যুদ্ধের জন্য নতুন কর্মসংস্থান হলো| ব্রজভাষার কবি বিয়োগী হরি (১৮৯৫-১৯৮৮) মূলত: মধ্য ভারতের হলেও ১৯৩৪ থেকে দিল্লি তে থাকছিলেন| তিনি আরো কয়েকজন উদীয়মান লেখকদের নিয়ে একটি আন্দোলন গড়ার চেষ্টা করলেন| এই দলটির মধ্যে ‘ঈশ’-অন্তক নামের ছড়াছড়ি ছিল – যেমন ছবেশ, দীনেশ, করুনেশ, কমলেশ ইত্যাদি|  এই সময় দিল্লির প্রথম হিন্দি উপন্যাসকার রামচন্দ্র তেওয়ারীর উদয় হলো| এ ছাড়া ও ব্রজ ভাষার হাস্য রসের কবি গোপাল প্রসাদ ব্যাস (১৯১৫-২০০৫) দিল্লীতে ঘাঁটি গাড়েন| প্রসঙ্গত সুভাষ চন্দ্র বসুর প্রশংসায়ে লিখিত তার একটি কবিতা বিখ্যাত হয়|

এই সময় দিল্লির বাইরে থেকে আসা অনেক কবি সাহিত্যিকরা এই শহর কে ঘাঁটি করে সাহিত্যচর্চা আরম্ভ করেন|তৈরি হয় ‘কবি সমাজ’ আর ‘নয়ী দিল্লি হিন্দি সাহিত্য সভা’| এত দিন উর্দুর মুশায়রা হত| এবার তারই অনুকরণে শুরু হলো হিন্দি কবি সম্মেলন, যা দিল্লির অবদান|  এই কবি সমাজের মধ্যে এত বিভিন্ন পেশার মানুষরা ছিলেন যে শুনে আশ্চর্য হতে হয়- কেরানি, লোহার ব্যাপারী, পুস্তক বিক্রেতা, ধর্মীয় কথাবাচক, অধ্যাপক, ডাক্তার, কম্পউণ্ডার, দর্জি ইত্যাদি| তাদের মাসে একবার করে সাহিত্য বৈঠক হত| কোজাগরী লক্ষ্মী পূজার রাতে (শরদ পূর্ণিমা) যমুনায় হত নৌকা বিহার| তারাই দিল্লির জনগণ কে কবিতা মুখী করে তোলেন| রাজেন্দ্রলাল হাঁন্ডা তার স্মৃতিচারণ ‘দিল্লি মে দশ বর্ষ’-এ তার বর্ণনা দিয়েছেন|

উনিশশো সাতচল্লিশ সালের ১৫ই আগস্ট স্বাধীনতার সঙ্গে রক্তক্ষয়ী দেশ ভাগ ও হলো| অবিভক্ত পাঞ্জাব প্রদেশের অর্ধেকটা পশ্চিম পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হলো| এর সঙ্গে সঙ্গেই সেখানে থেকে বিতাড়িত হিন্দু ও শিখেরা, যারা জীবিত পৌঁছুতে পারল, এসে দিল্লীতে শরণ নিল| ওদিকে দেওয়াল ঘেরা দিল্লির (walled city) অংশ থেকে অনেক মুসলমানদের দিল্লি ছেড়ে চলে যেতে হলো| দিল্লির জনসংখ্যার ভাষাগত এবং ধর্মীয় বিন্যাস অনেকটাই বদলে গেল| এতে হিন্দি সাহিত্যের লাভ হলো ও উর্দু সাহিত্যের রমরমা অনেক কমে গেল| অন্য দিকে স্বাধীন ভারতে হিন্দি কে সরকারি (official language) ভাষা ঘোষণা করার বিতর্কিত সিদ্ধান্তে হিন্দির কদর বেশ বাড়লো|

সে সব হিন্দু ও শিখ শরণার্থী দিল্লি এসে পৌঁছেছিলেন তাদের কথ্য ভাষা পাঞ্জাবি ছিল| কিন্তু সে যুগে পাঞ্জাবে ইংরেজির পর লিখিত ও শিক্ষার ভাষা উর্দু ছিল (পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত পাঞ্জাবে এখনো তাই)| ভারতীয় পাঞ্জাবে গুরুমুখীর সরকারি ভাষা হয়ে ওঠার কাহিনী (যা নিয়ে অনত্র আলোচনা করব) স্বাধীনতার অনেক পরের কথা| অবিভক্ত পাঞ্জাবে গুরুমুখী মূলত: শিখেদের ধর্মীয় ভাষা ছিল, যা না স্কুলে পড়ানো হত, না তাতে বিশেষ সাহিত্য রচনা হত| গুরুমুখী তে লেখা পাঞ্জাবি সাহিত্য কুড়ি শতকের, এমন কি স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ের সৃষ্টি| কিন্তু স্বাধীন ভারতে পাঞ্জাবিরা উর্দুর দিকে কেন গেলেন না?

উনিশ শতকের শেষ দিকে আর্য সমাজ পাঞ্জাবের হিন্দু সমাজের উপর প্রভাব বিস্তর করতে শুরু করে| শিক্ষার ক্ষেত্রে আর্য সমাজের বিশেষ ভূমিকা ছিল| আর্য সমাজ প্রচণ্ড ভাবে হিন্দির প্রচার শুরু করেছিল|আর্য সমাজ তৈরির আগের থেকেই (১৮৭২) ব্রহ্মানন্দ কেশব চন্দ্র সেনের পরামর্শে জন্মসূত্রে গুজরাতি ব্রাহ্মণ স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী সর্জাবানিক ব্যবহারের জন্য সংস্কৃত ছেড়ে হিন্দির শুরু করেছিলেন| জনগণনায়ে পাঞ্জাবের হিন্দু দের জিজ্ঞেস করলে তারা বলত তাদের ভাষা হিন্দি| এর জন্য স্বাধীনতার পরে ভারতীয় পাঞ্জাবে একটি বিতর্কও সৃষ্টি হয়| কিন্তু লক্ষ্য করবেন এই পাঞ্জাবী হিন্দুদের মধ্যে থেকেই হিন্দি সিনেমা জগতের বহু গান লেখক এসেছেন- গুলজার, আনন্দ বকশী, গুলশন বাবরা (গুলশান কুমার মেহতা), রাজেন্দ্র কৃষ্ণ ইত্যাদি|

স্বাধীনতার পরে দিল্লির হিন্দি সাহিত্য কে সমৃদ্ধ করলেন এক পাঞ্জাবি কাহিনীকার ও নাট্যকার| তাঁর নাম মদন মোহন গুগ্লানি  (১৯২৫-১৯৭২) যিনি মোহন রাকেশ নামে খ্যাত হন| তাঁর হিন্দি নাটক আষাঢ কা এক দিন, লেহরো কে রাজহন্স এবং আধে আধুরে ইত্যাদি কেবল দিল্লীতে কেবল মাত্র হিন্দি নাটক কে চাঙ্গা করে না, তাঁকেও হিন্দির প্রথম আধুনিক নাট্যকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে| তার ছোট গল্প গুলি ও মর্মস্পর্শী| মাত্র ৪৭ বছর বয়েস যখন দিল্লীতে তাঁর মৃত্যু হয়, তিনি প্রথম সারির হিন্দি লেখকদের মধ্যে পরিগণিত হতেন|

দেশ ভাগের কারণেই দিল্লীতে এলেন অমৃতা প্রীতম, কৃষ্ণা সোবতি, ভীস্ম সাহানি| অমৃতা পাঞ্জাবি সাহিত্যের একজন পথিকৃৎ ছাড়াও হিন্দির লেখিকা| কৃষ্ণা সোবতি হিন্দির বিশিষ্ট উপন্যাসকার, প্রাবন্ধিক| জীবিকার জন্য এসেছিলেন হরিবংশ রাই বচ্চন, শ্রীকান্ত ভার্মা, নির্মল ভার্মা, মনোহর শ্যাম যোশী, কেদার নাথ সিংহ, রাজেন্দ্র যাদভ, মৃদুলা গর্গ, প্রয়াগ শুক্ল ইত্যাদি| দিল্লিতে অনেক সরকারি চাকরি| এ ছাড়া দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়, জহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়, সাহিত্য একাডেমী, হিন্দি একাডেমী ইত্যাদি থাকায়ে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা বিদ্যমান| দিল্লির থেকে বহু সংবাদ পত্র, পত্রিকাও বেরুতে থাকে| 

রাজধানী হওয়ার দৌলতে দিল্লির ভাগ্যে অনেক কিছু জুটেছে| কিন্তু হিন্দি সাহিত্য কে যদি আমরা শুধু দিল্লির দৃষ্টি দিয়েই দেখি তাহলে বুঝতে হবে মস্তিষ্কে রক্ত জমে গেছে| দিল্লি একটা কৃত্রিম জিনিষ| দিল্লিতে কোনো প্রেমচাঁদ, জয়শংকর প্রসাদ, নিরালা তৈরি হতে পারেন না| দিল্লির থেকে দুরে বসেও মহাদেবী বর্মা, অমৃতলাল নাগর, হরিশংকর পরসাই, শ্রী লাল শুক্লা, শিব মঙ্গল সুমন, সুমিত্রা নন্দন পন্থ ইত্যাদি সাহিত্যকার প্রসিদ্ধ হয়েছেন| হিন্দি গজলের সৃষ্টিকর্তা দুষ্মন্ত কুমার (১৯৩৩-১৯৭৫) যার কাব্য গ্রন্থ ‘সায়ে মে ধূপ’ কে ইন্দিরা গান্ধীর জরুরী অবস্থার বিরুদ্ধে এক সুতীক্ষ্ণ সমালোচনা বলা হয় উত্তর প্রদেশ ও মধ্য প্রদেশে কাজ করেছেন| নাট্যকার শঙ্কর শেষ (১৯৩৩-১৯৮১) ছত্তিসগড় থেকে স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ায় হিন্দি অফিসারের কাজ নিয়ে মুম্বাই চলে যান| কমলেশ্বর, শরদ যোশী ও মনোহর শ্যাম যোশী ও সিনেমা – টেলিভিশন সিরিয়াল এর লেখনর সুবাদে মুম্বাই তে ছিলেন|

ইতিহাসের দিক থেকে দেখতে গেলে হয়তো ‘সস্তা সাহিত্য মণ্ডল’ যা ১৯২৫ এ গান্ধীজীর ইচ্ছাতে এবং ঘনশ্যাম দাস ও যমুনালাল বাজাজের আনুকূল্যে তৈরি হয় দিল্লির প্রথম হিন্দি প্রকাশন| কনৌট সার্কাসে তাদের অফিস আজ ও চলে আসছে| কিন্তু দিল্লিতে হিন্দির প্রথম সারির প্রকাশনী সংস্থান গুলি বেশির ভাগ ই স্বাধীনতার পরের| এর মধ্যে প্রভাত প্রকাশন, রাজকমল প্রকাশন, বাণী প্রকাশন, রাজপাল এন্ড সন্স কিতাব ঘর ইত্যাদি| এটা কি পুঁজিবাদের প্রভাব? দিল্লিতে মুদ্রণ সস্তা, পেশাদার ও কর্মচারী পাওয়া যায় এবং একটি পাঠকবর্গ আছে যাদের হাতে টাকা আছে| এ ছাড়া রাজনৈতিক দিক ও আছে| প্রভাত প্রকাশন কে যেমন ভারতীয় জনতা পার্টির কাছা কাছি মনে করা হয়| কিন্তু আমার ব্যক্তিগত ধারণা হিন্দির সাহিত্যের আসল কাজ দিল্লির বাইরেই হচ্ছে| প্রকাশকরাও তার খবর রাখেন| তাদের প্রকাশিত বইয়ের লেখকরা বহুলাংশে দিল্লির বাইরের|

Friday, April 13, 2018

প্রিয়দর্শী দত্ত

লোকো বাবু

প্রিয়দর্শী দত্ত



লোকেশ রঞ্জন তলাপাত্র ওরফে লোকো বাবুর  চারণকবি হিসেবে কোনো পুর্বাখ্যাতি ছিল বলে মনে হয় না| থাকলেও আমার জানার কথা না| কারণ আমি তো রাঁচি গেলাম এই প্রথম, তাও দিন ছয়েকের জন্য| ঠিক মানসিক চিকিত্সার জন্য নয়, যদিও যে অফিসে আমি কাজ করি, সেখানে আধপাগলা হয়ে গেল ও কিছু আশ্চর্যের বিষয় নয়| আমার সহকর্মী অংশুমান আমাকে প্রায় বগলদাবা করেই রাঁচি নিয়ে গেল| বলল চলুন এই ঘোলাটে আবহাওয়া থেকে সপ্তাহখানেক দুরে থাকলেও অনেকটা চাঙ্গা বোধ করবেন| সামনে তার ছোট ভাইঝির বিয়ে| অংশুমানের দাদা রাঁচি তে UCO না এলাহাবাদ কোন ব্যাঙ্ক-এর সিনিয়র ম্যানেজার| তিন বছর পর রিটায়র করে হয়ত কলকাতার দিকে চলে যাবেন|

আমার ‘পশ্চিম’ সম্পর্কে একটি দুর্বলতা আছে সেটা অংশুমান ভালো করেই জানে| সে যেদিন চাকরি তে যোগ দিল সে রাঁচির বাঙালি জানতে পেরে সেই দিনই তাকে জানিয়ে দিয়েছিলাম যে আমার স্বর্গত: ঠাকুরদা সরকারি কার্যসুত্রে দক্ষিন বিহার ও উড়িস্যার অনেক জায়গা চষে বেড়িয়ে ছিলেন| আরে আমার বাবার ছোটবেলাও তো কেটেছে দেওঘর এ|তাই তিনি হিন্দি তে এত পারদর্শী ছিলেন| এ ছাড়া বাংলা কথাসাহিত্যে ও তত্কালীন ইতিহাসে হওয়াবদল বা চেঞ্জএর উল্লেখ পাওয়া যেত তাতে তো জসিদিহ, গিরিদিহ, মধুপুর, হাজারিবাগ এ সব জায়গা আখছার| তাই সে সব জায়গা, বাঙালি হিসেবে, আমার খুবই পরিচিত মনে হয়| কেবল কোনো দিন যাওয়া হয়ে ওঠেনি|

‘এবার হবে’ অংশুমান বলল| ‘সেকি তোমাদের বাড়িতে নেমত্তনো করেনি, আর আমি অনাহুত রবাহুতদের মত পৌঁছে যাব’ আমি প্রতিবাদ করি| আরে বাবা, আমি মেয়ের কাকা, সে বলল আচ্ছা এক্ষুনি কার্ড আসছে| সে রুম থেকে বেরিয়ে গিয়ে মোবাইলে কাকে কি একটা জানালো| একটু পরেই দেখি আমার মোবাইল ফোন একটা ইমেইল এসে হাজির| ‘Dear Mr. Sen Sharma, I shall feel gratified if you can attend our younger daughter Sriparna Bhadra’s wedding at Ranchi as per the invite attached. Kindly allow us the privilege to host you. Let me assure you will not have the slightest inconvenience. My younger brother Anshuman will coordinate”.  এটাচমেন্ট এ রয়েছে সোনালী রঙের একটা কার্ড, ইংরেজি ও বাংলাতে| সেটা খুলে দেখলাম তখন দেড় মাস সময় রয়েছে| অফিসে অন্য কাউকে আর নিমন্ত্রণ করা হলো না| এ সেকশন এ আমরা দুজন ই বাঙালি, বাকিরা জানলেও রাঁচি যাবার উত্সাহ কারুর নেই| আবার যদি জানতে পারে যে বাঙালিদের বিয়েতে মদ্যপানের ব্যবস্থা নেই, যাদের একটু আধটু উত্সাহ থাকতে পারে, সেটাও স্থিমিত হয়ে যাবে|


রাঁচি তে ভদ্র পরিবার যেখানে থাকে জায়গাটার নাম বর্ধমান কম্পাউন্ড| এটা জৈনদের তীর্থঙ্কর মহাবীর বর্ধমান থেকে নয় মনে হয়| ইংরেজি তে Burdwan লেখা হয় যেমন ইংরেজ যুগে বর্ধমান শহরের নাম লেখা হত| বর্ধমান বাসী কোনো বাঙালি এটা স্থাপন করেছিলেন কিনা বলতে পারব না| বিয়েতে তখনো দু দিন বাকি ছিল| শ্রীপর্না মিষ্টি মেয়ে| ওর জন্য মজুমদার এন্ড সন্স থেকে নিয়ে গিয়েছিলাম ফিরোজী রঙের শাড়ি আর চিত্তরঞ্জন পার্কের আনন্দ পাবলিশার্সের দোকান থেকে সমরেশ বসুর ‘দেখি নাই ফিরের’ একটি কপি| কিন্তু জানতে পারলাম শ্রীপর্না নাকি ঠিক মত বাংলা পড়তেই পারে না| বিহার ঝাড়খন্ড ইত্যাদি রাজ্যে গত ২৫/৩০ বছরে বাংলা শিক্ষাপ্রতিষ্টান গুলির অবনতি ঘটেছে| আসলে অবনতি ঘটেছে বাঙালিদের সাবেকি প্রতিপত্তির| এর জন্যে সেখানের রাজনীতি যে দায়ী বলা বাহুল্য| জামেশেদপুরের বিষয় জানি না| কিন্তু অন্য জায়গায় নয় বাংলা স্কুল নেই, স্কুল থাকলেও বাঙালি শিক্ষক নেই, বই নেই| আবার বাঙালিদের মধ্যে সন্তানদের বাংলা শেখাবার ইচ্ছে যে ১৬আনা তাও বলা যায় না| কারিগরি বা রোজগারী শিক্ষার উপর ই জোর বেশি|

কিন্তু শুনে আশ্চর্য লাগলো শ্রীপর্না বললো সে রবীন্দ্রনাথের অনেক গুলি কবিতা জানে|  কোথায় শিখলে, জানতে চাইলাম| কয়েকটা সে শিখেছিল রাঁচি তেই থর্পাকনার প্রাথমিক স্কুলে, আর এখন কয়েকটা শিখেছে লোকো কাকুর কাছে| লোকো কাকু কে? সেই প্রথম শুনলাম লোকেশ রঞ্জন তলাপাত্র’র কথা| ভদ্রলোক ছোট ছেলেমেয়ের থেকে বড়দের অবধি রবীন্দ্রনাথে কবিতা শিখিয়ে বেড়ান| ভদ্রলোক কি সাহিত্য সংস্কৃতির চর্চা করেন| ‘আরে না, না সাহিত্যিক, তাহিত্যিক নয়, ওই ছোট ছেলেমেয়েদের মাতিয়ে বেড়ায়ে’| শ্রীপর্নার সাথে কথা বলতে বলতে লক্ষ্য করিনি ধৃতিমান বাবু (অংশুমানের দাদা)-র বৈঠকখানাতে আমার পাশেই বসে এক প্রবীন ভদ্রলোক ফিস ফ্রাই মনের সুখে ফিস ফ্রাই চর্বণ করছিলেন| জানলাম উনি বিশ্বম্ভর চট্টোপাধ্যায়, তিন প্রজন্ম রাঁচি প্রবাসী হয়েও, বাংলায় সাহিত্য চর্চা করেন| কলকাতা, শিলং, বিলাসপুর ইত্যাদি থেকে প্রকাশিত কয়েকটি পত্রিকাতে উনি নিয়মিত লেখেন| ওনার নতুন একটি উপন্যাস যন্ত্রস্থ, কয়েকদিনের মধ্যেই ছেপে বেরুবে|

বরযাত্রী ও অনান্য অতিথিদের থাকার জন্য কাছেই হোটেল ল্যান্ডমার্কে ব্যবস্থা হয়েছিল| এ ছাড়াও কম্পাউন্ড এ কিছু খালি বাড়ি ভাড়া নেওয়া হয়েছিল| একটা বাড়তি বেড লাগিয়েও কমপক্ষে ২৭৫০/- টাকা এক দিনের| খরচার সবটাই অবশ্য ধৃতিমান বাবুর| তবুও আমি বললাম না এখানে অন্য কারুকে থাকতে দাও, আমার একটা কাম্বিশের খাট হলেও চলে যাবে| রাঁচি তে এসে হোটেল বন্দী হওয়ার চেয়ে বাক্স বন্দী হওয়া ভালো| আপত্তি অংশুমান সত্যেও বর্ধমান কম্পাউন্ড এর একটা খালি বাড়িতে রইলাম| কিন্তু খাত কোথায়| দুন টেন্ট হাউসএর লোকেরা গদি, বালিশ, পাস বালিশ, চাদর ইত্যাদি দিয়ে গেল| ফাল্গুন মাসে তখনো ঠান্ডা রয়েছে|

ভাবতে পারিনি ঠিক তার পর দিন সকালেই লোকো বাবুর সাথে দেখা হবে| ভাড়া করা বাড়িটাতে বুঝতে পারিনি আরো কিছু অথিতি এসে রাত্তিরে ছিল| হোটেলের প্রাইভেসী ছিল না| সকালে স্নান করে বেরিয়েছিলাম সংবাদ পত্রের খোঁজে| একটা পাড়ার ভিতরেই একটা ভেন্ডর কে পেলাম, সে বললো একটাই ‘প্রভাত খবর’ (হিন্দি দৈনিক) বেঁচেছে| বললাম তাই সই, কিনে নিলাম পাঁচ টাকা দিয়ে| এই সময় দেখি সামনে একটা বাড়ি তাতে লেখা ‘মায়ের আশির্বাদ’ সন্দীপ মালাকার সেখান থেকে কয়েকজন দামাল ছেলে পরিবৃত হয়ে এক  ভদ্রলোক বেরুচ্ছেন| লম্বায়ে প্রায় ৬ ফুট, চেহারা ভালো, কাঁচাপাকা দাড়ি| একটি ছেলে হঠাত জীভ কেটে বলল লোককাকু শেষ চারটে লাইন ভুলে গেলাম|ভদ্রলোক বললেন দাঁড়া দেখি| বলে পকেট থেকে একটা লাভার স্মার্ট ফোন বার করে কি একটা খুঁজে পড়লেন- “

“রাত্রি হইবে শেষ/ উষা আসি ধীরে/ দ্বার খুলি দিবে তব/        ধ্যানমন্দিরে।

জাগিবে শক্তি তব/  নব উৎসবে,/রিক্ত করিল যাহা/  পূর্ণ তা হবে।

ডুবায়ে তিমিরতলে/ পুরাতন দিন/হে রবি, করিবে তারে/ নিত্য নবীন”।

সেই ছেলেটি নিজের মোবাইল এ জিনিষটা রেকর্ড করে নিল| এবার ভদ্রলোক বললেন কাল পুরোটা মুখস্থ করে, রেকর্ড করে, আমাকে whatsapp করে পাঠিয়ে দিবি| শুরুতে কবিতার নাম, বইয়ের নাম, তপস্যা, চিত্রবিচিত্র| খুব সুন্দর আবৃত্তি করলেন ভদ্রলোক, যাঁকে আমি চিনে গেছি, লোকো দা বা লোকো কাকু| আমার অজান্তেই আমি ওনার কাছে এসে দাঁড়িয়েছি|

আমাকে দেখে উনি চোস্ত হিন্দি তে বললেন বাতাইয়ে, মুঝ সে কাম হ্যায়| নমস্কার করে বললাম আমি বাঙালি, আসছি দিল্লি থেকে, নাম অর্চন সেন শর্মা| একটা বিয়ে বাড়িতে এসেছি| ‘কার বিয়ে, শ্রীপর্নার তো?’ আমি বললাম হ্যা| এই সামনেই উঠেছি, সময় থাকলে চলুন না কিছুক্ষণ| উনি বললেন আপনি বরং চলুন আমার সঙ্গে এই সামনেই|

দশ মিনিট হেঁটে আর একটা বাঙালি বাড়িতে পৌঁছে গেলাম| বাড়ির মালিক অরুন কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়|তাঁর দুই ছেলে এক জন ক্লাস ফাইভে পড়ে আর একজন আট ক্লাসে| অলোক আর আনন্দ| তাদের তিনি রবিবারে কবিতা শেখান| এবার দেখলাম ওনার পদ্ধতি| কোনো খাতা নেই কোনো বই নেই, কবিতা কে তার মুখস্থ তাও নয়| কিন্তু প্রযুক্তি কে ব্যবহার করছেন ১৬ আনা| স্মার্ট ফোনে tagoreweb.in বলে একটি ওয়েবসাইট বার করলেন| আমাকে বললেন এ ছাড়া আর একটা সাইট আছে www.rabindra-rachanabali.nltr.org তাতে ও রবীন্দ্রনাথের সব লেখা আছে|’অর্থাত হাতের মুঠোয় বিশ্বকবির সব কৃতি’| সে সব ছেলারা স্কুলে বাংলা পড়ে না, এবং বাংলা সাহিত্য সম্পর্কে কিছু জানবে না, আমি তাদের কাছে রবীন্দ্রনাথ কে এনে দিয়েছি| তাদের রবীন্দ্রনাথ কে জিজ্ঞেস করলে আর বলতে হবে না-‘He won the Nobel Prize in 1913 for Gitanjali. He wrote our national anthem. He returned knighthood in protest against Jalianwala Massacre in 1919’|

প্রযুক্তি আপনার সহায়ক হয়েছে বলতে হবে| ‘নিশ্চই’ আমি প্রযুক্তির মানুষ| দিসেল ইঞ্জিন চালাতাম| আমাকে সবাই লোকো বাবু, লোকো কাকু, লোক তলাপাত্র বলে| আমি হঠাত বেফাঁস বলে বসলাম বিশ্বম্ভর চট্টোপাধ্যায় কে চেনেন| লোকো বাবু একটু বিরক্ত হয়ে বললেন, দেখুন আমি সাহিত্যিক নই| কিন্তু নতুন প্রজন্ম কে তৈরী না করলে আপনার ভালো ভালো লেখার পাঠক তো থাকবে না| ওঁর নাতি বাংলার ধার ধরেনা, উনি সাহিত্যিক হয়ে বিশ্ব পৃথিবীতে খ্যাতি চান| উনি ওপর থেকে জল ঢালছেন, কিন্তু তলা ফুটো হলে কি করে চলবে, এই তলাপাত্র সেই তলা মেরামতের কাজ করছে| 

জিজ্ঞেস করি রাঁচি তে বাংলা সাহিতয় চর্চা হয়| উনি বললেন হয় বটে, আমাকে তারা পাত্তা দেয় না| আমি মশায় নকশাল উপদ্রুত এলাকা দিয়ে প্রতি সকালে পাইলট লোক নিয়ে গেছি, এ সব মানুষদের পরোয়া করি না| তবে আমার কাজে ভবিষ্যতে এদের ই উপকার হবে| ৮০ জন ছাত্র আমার, সব ফ্রি তেই, বিশ্বম্ভর বাবু বলবেন ঘরের খেয়ে, বনের মোষ তাড়াই, তাই সই| ঝাড়খন্ডে বাংলা কে বাঁচাতে হবে, আমি যত টুকু পারি করছি|

লোকো বাবুর সাথে কথা বলে ভিতরে ইঞ্জিনের শক্তি অনুভব করলাম| ওদিকে অলোক বলতে শুরু করেছে- দুন্ধুভি বেজে ওঠে ডিম ডিম রবে/সাঁওতাল পল্লীতে উৎসব হবে'।

Facebook Comments